পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অপ্রত্যাশিত জয়, মমতার কারচুপির অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অপ্রত্যাশিত জয়, মমতার কারচুপির অভিযোগ

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের তুলনায় এবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আরও খারাপ ফল করবে—তৃণমূল কংগ্রেসের এই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠন করেছে গেরুয়া শিবির। অপ্রত্যাশিত এই নির্বাচনী বিপর্যয় এখনো সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি তৃণমূল নেত্রী ও রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে অন্তত ১০০টি আসনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে জরুরি বৈঠক

এই চরম রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে পরাজয়ের ধাক্কা সামলে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ এবং নতুন করে সংগঠন ঢেলে সাজাতে আগামী শুক্রবার দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, রাজ্যের মসনদে বসেই পূর্বতন সরকারের লোগো ও একাধিক সিদ্ধান্ত বাতিল করে, কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু এবং নারীদের জন্য বড় আর্থিক অনুদানের ঘোষণাসহ একগুচ্ছ জনমুখী কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

কালীঘাটের বৈঠকে কী হবে?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আগামী শুক্রবারের এই হাইভোল্টেজ বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন বিভিন্ন জেলার শীর্ষ নেতা, নবনির্বাচিত ও পরাজিত বিধায়ক এবং সংসদ সদস্যরা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই বৈঠক থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতাদের কাছ থেকে হারের সুনির্দিষ্ট কারণ ও পরামর্শ শুনবেন এবং সেই অনুযায়ী আগামী দিনে দলকে নতুন করে সাজানোর দিকনির্দেশনা দেবেন। পরাজয়ের পরও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে তৃণমূল নেত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, তৃণমূল এই রাজ্যে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে; আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে তারা নতুন শাসক দলের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুভেন্দু অধিকারীর ম্যারাথন বৈঠক ও নতুন প্রকল্প

বিরোধী শিবিরের এমন তৎপরতার মধ্যেই গতকাল রাজ্য সচিবালয়ে (নবান্ন) পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং দলীয় বিধায়কদের নিয়ে দিনভর ম্যারাথন বৈঠক করেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিজেপি সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হলো ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলা, শিল্পায়নের প্রসার ঘটানো এবং সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের স্থায়ী সমাধান করা। দিল্লি ও কলকাতার ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের যৌথ প্রয়াসেই রাজ্যের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।

নতুন প্রকল্প ও নীতি পরিবর্তন

নবান্নের বৈঠক থেকেই শুভেন্দু অধিকারী পূর্বতন তৃণমূল সরকারের একাধিক নীতি ও লোগো বাতিলের পাশাপাশি একগুচ্ছ নতুন প্রকল্প চালুর ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে যে কেন্দ্রীয় ‘আয়ুষ্মান ভারত’ স্বাস্থ্য প্রকল্প চালুর অনুমতি দেননি, তা গতকাল থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের নাগরিকেরা পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের যেকোনো নামী হাসপাতালে বছরে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। এছাড়া আগামী ১ জুন থেকে চালু হতে যাচ্ছে নারীদের জন্য বিশেষ ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় মমতার আমলের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর ১ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে অনুদান পাবেন বাংলার মায়েরা ও বোনেরা। পাশাপাশি রাজ্যের সব সরকারি বাসে নারীদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধাও চালু করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক পরিবর্তন ও বয়সসীমা বৃদ্ধি

প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও এক বড়সড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বহস্তে তৈরি করা ‘বিশ্ববাংলা’র লোগো সম্পূর্ণ বাতিল করে এখন থেকে সব সরকারি ক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় প্রতীক ‘অশোক স্তম্ভ’ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, এতদিন রাজ্য স্তরে আটকে থাকা কেন্দ্রীয় আইন ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (যা পূর্বতন ভারতীয় দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধিত রূপ) অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি স্পষ্ট করে দেন, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে রাজ্যের কোনো পুরোনো ও চলমান জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না, তা ৩০ বছরের পুরোনো হলেও সচল থাকবে। এর পাশাপাশি, বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর বড় ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে সাবেক তৃণমূল সরকারের আমলে ৬০ বছর বয়সের পর যেসব সরকারি কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ (রি-অ্যাম্প্লয়মেন্ট) দেওয়া হয়েছিল, তাদের সবার নিয়োগ অবিলম্বে বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।