প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুসরাত চৌধুরী বলেছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মব সহিংসতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে সহিংসতা অবলম্বন করছে।
মব সহিংসতার কারণ
নুসরাত চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে 'ফাঁকা মাঠ' তৈরি হয়েছে। এতে অরাজকতা ও অস্থিরতা বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, আইন নিজের হাতে তোলার প্রবণতা আগেও ছিল, কিন্তু এখন তা মব সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়
তিনি বলেন, মব সহিংসতায় অংশগ্রহণকারীদের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। ক্রাউড সাইকোলজির তত্ত্বগুলো এলিটিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সীমাবদ্ধ। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
রাজনৈতিক কৌশল
মব সহিংসতা প্রচলিত রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে আলাদা কিনা—এ প্রশ্নে নুসরাত বলেন, এটি অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভিজিল্যান্টি ভায়োলেন্স নতুন নয়, তবে ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে মবকে সংগঠিত করার পদ্ধতি ও বয়ান নতুন রাজনৈতিক চরিত্র পেয়েছে।
মবের সংজ্ঞা
মবের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। নুসরাত বলেন, 'মব' শব্দটির মধ্যে নেতিবাচক মূল্যবোধ নিহিত। হান্নাহ আরেন্ডট মবকে জনতার 'ক্যারিকেচার' বলেছেন। মব প্রায়ই স্বতঃস্ফূর্ত নয়, বরং পরিকল্পিত ও ম্যাস মিডিয়েটেড।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে মবকে ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। লক্ষ্যবস্তু প্রায়ই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যেমন নারী বা সংখ্যালঘু। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ভিকটিম দাবি করলেও বাস্তবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। ধারাবাহিক ঘটনা একটি প্যাটার্ন তৈরি করছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে তুলনা
ভারত ও পাকিস্তানে মব সহিংসতা প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে। ইরফান হাবিব একে 'মবোক্রেসি' বলেছেন। বাংলাদেশে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে নতুন, তবে একই স্ক্রিপ্ট অনুকরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এখনো চরমে পৌঁছায়নি, তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধ জরুরি।
একাডেমিক ফ্রিডম
মব সহিংসতা একাডেমিক ফ্রিডম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও হুমকি। নুসরাত বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ সবচেয়ে বিপজ্জনক। মানুষ কথা বলতে ভয় পেলে তা স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার লক্ষণ।
সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মব তৈরিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সহিংসতা উসকে দেয়। বাংলাদেশে এখনো ভারতের মতো চরম অবস্থা না হলেও ঝুঁকি স্পষ্ট।
পুরুষতন্ত্রের সম্পর্ক
মব সহিংসতার সঙ্গে পুরুষতন্ত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ পুরুষ, এবং এটি পুরুষালি ক্ষমতা প্রদর্শনের রূপ নেয়। বেকার যুবকদের জন্য এটি সামাজিক ভূমিকা ও স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের হুমকি
নুসরাত বলেন, মব সহিংসতা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি, বিশেষ করে যখন এটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। তবে রাষ্ট্রের উচিত সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া, জোরপূর্বক দমন না করা।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
অনেকে আশা করেছিলেন নির্বাচিত সরকারের আমলে মব সহিংসতা বন্ধ হবে, কিন্তু তা হয়নি। নুসরাত বলেন, রাষ্ট্রের সবার অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগী ভূমিকা না নিলে সহিংসতা চলতেই থাকবে। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।



