যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মুখে মাস্ক পরে এবং হাতে ‘আমি তেলাপোকা’ পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সিজেপির এক সমর্থক। ৬ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই।
আগেই জানিয়েছিলেন ‘ককরোচ জাতীয় পার্টি’র (সিজেপি) সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা। কথা রাখলেন লাদাখের বিশিষ্ট পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। শনিবার দুপুরে যন্তর মন্তরে গিয়ে তিনি যোগ দেন সিজেপির প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশে। সেই সমাবেশে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ‘তেলাপোকারা’ দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তুলবে। এ ছাড়া ১৩ জুন আবার যন্তর মন্তরে সমাবেশের আয়োজন করা হবে।
মহারাষ্ট্রের এনসিপি (শরদ পাওয়ার) নেতা রোহিত পাওয়ারও সিজেপির দাবি–দাওয়া সমর্থন করেছেন। আজ শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নিট ও সিবিএসই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা নিয়ে সিজেপির আন্দোলনে দেশের যুবসমাজ যেভাবে সাড়া দিয়েছে, তা সরকারের ব্যর্থতা ও সরকারি নীতির প্রতি অনাস্থারই প্রকাশ। এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, যুবসমাজ কতটা হতাশ।
আজ স্থানীয় সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল সিজেপিকে। তার আগে এই আন্দোলনের নেতা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা অভিজিৎ দীপকে জানান, শনিবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ানো হবে।
অভিজিৎ বলেন, সপ্তাহজুড়ে দেশের সর্বত্র যুবসমাজ বিক্ষোভ দেখাবে। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ১৩ জুন শনিবার আরও একবার যন্তর মন্তরে সিজেপির সমাবেশ হবে।
সোনম ওয়াংচুকও এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। অভিজিৎ দীপকের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই সমাবেশকে বিক্ষোভ বলা ঠিক হবে না। সরকারের প্রতি এটা একধরনের আবেদন। পদত্যাগের দাবির চেয়েও আমি চাই, সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে যাবতীয় দুর্নীতির দায় নিক।’
ওয়াংচুক বলেন, সরকার এই সমাবেশ করতে দিয়েছে। অনুমতি বাতিল করেনি। এটা ভালো দিক। গণতন্ত্রে ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত। তাঁর আশা, সরকার ভবিষ্যতেও এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেবে।
সোনম ওয়াংচুক ছয় মাসের বন্দিদশার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ‘দেশবিরোধী’ কাজের অভিযোগে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হলেও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান।
সিজেপির সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগের দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থন জানিয়ে ৫৯ বছরের এই পরিবেশবিদ বলেছিলেন, ‘এখন যাব না তো কবে যাব? এটাই তো যাওয়ার সময়।’
শনিবার সমাবেশ শেষ হলে ওয়াংচুক ও অভিজিৎ এক সঙ্গে যন্তর মন্তর ছেড়ে চলে যান।
দেশে ফেরার কয়েক দিন আগে অভিজিৎ গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আশঙ্কা করছি, দেশে ফিরলে আমার স্থান হবে তিহার জেলে।’ সমাবেশস্থলে শনিবার সেই কথারই রেশ টেনে অভিজিৎ বলেন, ‘আমার মা ও বোনের আশঙ্কাও ঠিক তেমনই ছিল।’
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তৃতা করছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এ সময় দলের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কাও উপস্থিত ছিলেন। ৬ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই।
শনিবার দুপুরে এক্স হ্যান্ডলে এক পোস্টে সেই কথা জানিয়ে অভিজিৎ লিখেছেন, ‘বিদেশে যাওয়ার সময় মা যতটা ভয় পেয়েছিলেন, ফেরার সময় তার চেয়ে বেশি ভীত হয়ে পড়েছিলেন। ভেবেছিলেন, ফিরলেই আমাকে কারাগারে ঢোকানো হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আর কত কাল আমরা এই রকম ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকব।’
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সম্প্রতি এক মামলার শুনানিতে দেশের তরুণসমাজের একাংশের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একশ্রেণির তরুণ রয়েছেন, যাঁরা কোথাও কিছুই করতে পারেননি। কোনো পেশায় জায়গা করে নিতে পারেননি। কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেননি। তাঁদের কেউ সাংবাদিক হয়েছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে গেছেন, কেউ আইন পেশায়, কেউবা তথ্য জানার অধিকার আন্দোলনের কর্মী। প্রধান বিচারপতি এই তরুণদের ‘পরজীবী ও তেলাপোকা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
এ ঘটনার পরই জেন–জি প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত অভিজিৎ দীপকে সেই তেলাপোকার নামেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ককরোচ জাতীয় পার্টি (সিজেপি) গড়ে তোলেন।
ভারতে ফিরছেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে। ০১ জুন ২০২৬। নিট বা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট একমাত্র সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেন। এই পরীক্ষারই প্রশ্নপত্র সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। অকূলপাথারে পড়েছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী।
এরপর শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো দাবি উঠেছে। দাবি তুলেছে ককরোচ বা তেলাপোকা পার্টিও। সিজেপির দাবিতে লাখ লাখ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন, তা সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রী দায় গ্রহণ করেননি। ককরোচ বা তেলাপোকারা তাই ঠিক করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে বেরিয়ে পথে নেমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শামিল হবে। আজ সেই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হলো।



