মেটার নীতি অনুযায়ী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ফেসবুক কনটেন্ট থেকে আয় করতে পারেন না। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তত ১৩ জন সংসদ সদস্য এই নীতি উপেক্ষা করে ফেসবুক থেকে আয় করছেন, যার মধ্যে তিনজন মন্ত্রিসভার সদস্যও রয়েছেন। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
তিন মন্ত্রীসহ ১৩ এমপির ফেসবুক মনিটাইজেশন
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৩টি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলের মধ্যে সাতটি বিএনপির, পাঁচটি জামায়াতে ইসলামীর এবং একটি স্বতন্ত্র এমপির। মন্ত্রিসভার তিন সদস্য হলেন— বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
সর্বোচ্চ অনুসারী জামায়াত এমপির
তালিকায় থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুসারী পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের। তার ফেসবুক পেজে অনুসারীর সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। ২০১৮ সাল থেকেই তার পেজটি মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম ডিসমিসল্যাবকে বলেন, তার আইটি টিম পেজটি পরিচালনা করে এবং তার জানা মতে, ফেসবুক থেকে তিনি কোনো আয় করেন না। তবে তিনি মনে করেন, রাজনীতিবিদদেরও মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকা উচিত।
নির্বাচনের আগে-পরে মনিটাইজেশন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তত দুটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরও মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজীব প্রধানের অ্যাকাউন্ট ৪ ফেব্রুয়ারি এবং চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের অ্যাকাউন্ট ১১ ফেব্রুয়ারি (ভোটের ঠিক আগের দিন) মেটার এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
হাসনাত আব্দুল্লাহর অ্যাকাউন্ট থেকে মনিটাইজেশন সরানো
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টটি ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনার সময় অ্যাকাউন্টটি আর মেটার বর্তমান অংশীদার-প্রকাশক তালিকায় উপস্থিত ছিল না। তবে হাসনাতের সঙ্গে যুক্ত আরও দুটি ফেসবুক পেইজ মেটার অংশীদার-প্রকাশকের তালিকায় রয়ে গেছে।
মেঘনা আলমের ক্ষেত্রে নীতি প্রয়োগ
ডিসমিসল্যাব এমন একটি ঘটনার সন্ধান পেয়েছে, যেখানে মেটা বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রার্থীকে শনাক্ত করার পরে মনিটাইজেশন বাতিল করেছে। ঢাকা-৮ নির্বাচনি এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মেঘনা আলম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন। নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে ২৮ জানুয়ারি তার অ্যাকাউন্টের মনিটাইজেশন চলে যায়। মেঘনা আলম ডিসমিসল্যাবকে জানান, মেটা তাকে একটি নোটিশ পাঠিয়ে বলেছে, মনিটাইজেশন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য সীমাবদ্ধ। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৫ ফেব্রুয়ারি তার মনিটাইজেশন পুনর্বহাল করা হয় এবং ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনার সময় সক্রিয় ছিল।
অযাচাইকৃত অ্যাকাউন্টও মনিটাইজেশনে
ডিসমিসল্যাব মেটার অংশীদার-প্রকাশক তালিকায় বাংলাদেশি আইনপ্রণেতা এবং মন্ত্রীদের নামে কমপক্ষে ২২টি অযাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামে একটি প্রোফাইল ছিল, যার ৪৪ হাজারের বেশি অনুসারী ছিল। পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলমের নামে একটি প্রোফাইল ও একটি পেইজ পাওয়া গেছে, যার অনুসারী যথাক্রমে ৪৬ হাজার ও ৫৭ হাজার।
নির্বাচনের পর মনিটাইজেশন
কিছু অযাচাইকৃত অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের পরে মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দেয়। গাজীপুর-৩ থেকে সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম এবং নওগাঁ-৫ এর সংসদ সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম ধলুর ফেসবুক পেজে যথাক্রমে ১২ মার্চ এবং ২০ এপ্রিল যোগ দেওয়া হয়েছিল। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি প্রচারণার সময় রফিকুল ইসলামের পেইজে ২৩টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালিয়েছিল।
জামায়াতের আট অ্যাকাউন্ট
পার্টনার ও প্রকাশক তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের নামে আটটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বলে দেখেছে ডিসমিসল্যাব। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের জহিরুল ইসলাম, ফরিদপুর-১ আসনের মো. ইলিয়াস মোল্লা এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনের মো. আবু তালেবের নাম রয়েছে— যারা নির্বাচনি প্রচারণার সময় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালিয়েছিল। কুষ্টিয়া-৩ আসনের মুফতি আমির হামজার নামে আরেকটি অ্যাকাউন্টের ৮ লাখেরও বেশি অনুসারী ছিল।
স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি সম্ভাব্য ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করে। কারণ, যারা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ বা এ-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন, তারাই যদি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পান, তবে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্ন ওঠে।’
ডিসমিসল্যাব এ বিষয়ে মেটার কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।



