সম্পাদকীয়: সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৩ জন মৌয়ালের বনদস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়া এবং অমানুষিক নির্যাতনের পর মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসার ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ২০১৮ সালের শেষের দিকে সুন্দরবনকে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক সফল অভিযানের পর দীর্ঘ সময় বনে একধরনের শান্তি বজায় ছিল। কিন্তু কয়রা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ভুক্তভোগী মৌয়ালরা সম্প্রতি যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, তাতে প্রমাণিত হয়—বনের গহিনে আবারও সশস্ত্র দস্যু বাহিনীর অভয়ারণ্য গড়ে উঠছে।
দস্যুদের দুঃসাহস ও চ্যালেঞ্জ
প্রথম আলোর খবরে এসেছে, বন বিভাগের পাস-পারমিট নিয়ে বৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশের পর ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামের একটি দস্যুদল মৌয়ালদের জিম্মি করে। দস্যুরা শুধু ৮২ হাজার টাকা মুক্তিপণ ও নৌকার সব মালামাল লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি; শরীরের কোথাও টাকা লুকানো আছে কি না, তা দেখতে বয়স্ক মানুষসহ সবার পোশাক খুলে তল্লাশি করেছে। এটি স্পষ্টতই শারীরিক নিপীড়ন। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো দস্যুদের দুঃসাহস। তারা প্রকাশ্যে নিজেদের ভিজিটিং কার্ড দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বনে ঢোকার আগে ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছে! এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার শামিল। এ ছাড়া ফেরার পথে মৌয়ালদের ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’ নামের আরও একটি সশস্ত্র দলের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা স্পষ্ট করে যে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জলভাগে একাধিক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র নতুন করে রাজত্ব কায়েম করেছে।
স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশ
দস্যুদের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশের পুরোনো সত্যটিও এবার ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ সূত্র ধরে নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত করতে হবে। রাজনৈতিক বা স্থানীয় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কেউ যেন বনদস্যুদের মদদদাতা বা গডফাদার হিসেবে কাজ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। নেপথ্যের এই কারিগরদের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দস্যুতার স্থায়ী সমাধান আসবে না। পাশাপাশি অপরাধস্থল কোন থানার এখতিয়ারভুক্ত—এমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ব্যবস্থা গ্রহণে যেন কালক্ষেপণ না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা এ দেশের অত্যন্ত প্রান্তিক ও হতদরিদ্র জনপদ। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চরম প্রাকৃতিক বৈরিতার মধ্যে তাঁরা জীবিকার সন্ধানে গহিন বনে যান। সেখানে তাঁদের জীবনের এই নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অত্যন্ত অমানবিক। র্যাব, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও বন বিভাগকে অনতিবিলম্বে সুন্দরবনে আবারও কঠোর ও সমন্বিত অভিযান শুরু করতে হবে। ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’-এর যে বড় অর্জন একসময় সারা দেশে স্বস্তি এনেছিল, তার ধারাবাহিকতা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।



