নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আদাতোলা সীমান্তে শূন্যরেখায় তিন পুরুষ, তিন নারী ও তিন শিশু—মোট নয়জন আটকে পড়েছেন। বুধবার ভোর ৪টার দিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কতায় তা ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে তারা খোলা আকাশের নিচে রোদ ও বৃষ্টির মধ্যে খাদ্য ও পানি ছাড়া অবস্থান করছে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ১৩ ঘণ্টা কেটে গেছে।
বিএসএফ-বিজিবির অবস্থান
বিএসএফ দাবি করছে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশি নাগরিক। অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে আনুষ্ঠানিক যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এই রাষ্ট্রীয় স্তরের টানাপোড়েনে আটকে পড়া ব্যক্তিরা পরিচয়, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভোর থেকে তারা খোলা আকাশের নিচে। কোনো খাবার বা পানি নেই। এভাবে রোদে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
সীমান্তে পুশ-ইন বাড়ছে
সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ও ‘পুশ-ব্যাক’ ঘটনা বেড়েছে। গত ৫ জুন লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে একাধিক পুশ-ইন চেষ্টার কথা জানিয়েছে বিজিবি। ১২ জুন নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম ডিজি-স্তরের সীমান্ত বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়। বিজিবির তথ্যমতে, ভারত বাংলাদেশে ভারতীয় নাগরিক, রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার নাগরিকদের ঠেলে দিচ্ছে। ঢাকা অবিলম্বে এ অভ্যাস বন্ধে ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছে।
ভারত অবশ্য দাবি করছে, তারা নিজস্ব আইনি কাঠামোর অধীনে অনিবন্ধিত বিদেশিদের ফেরত দিচ্ছে। তবে পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সংসদে জানানো তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ২,৩৬৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২,১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর, ১১ জনকে বিএসএফ-এ ফেরত ও ১৮৩ জনকে পুশ-ব্যাক করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজিবি ৩৬টি পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত করেছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রত্যাবর্তনের আগে আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, নথিভুক্ত সিদ্ধান্ত এবং নারী, শিশু, নির্যাতনের শিকার ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বিশেষ স্ক্রিনিং। আইনি সহায়তা ও সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, শূন্যরেখায় নারী ও শিশুদের দীর্ঘ সময় রাখা মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সঠিক ও স্বচ্ছ যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া বা সীমান্তে আটকে রাখা উচিত নয়।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাক গভীর উদ্বেগের। ব্যক্তিদের পরিচয়, জাতীয়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন যাচাই ছাড়া স্থানান্তর করা হচ্ছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, শিশু, নারী, বয়স্ক, রোহিঙ্গা ও দরিদ্র সীমান্তবাসীদের জন্য পারিবারিক বিচ্ছেদ, মানবপাচার, সহিংসতা ও খাদ্য-চিকিৎসার অভাবের ঝুঁকি বাড়ছে।
ইজাজুল ইসলাম আরও জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যার মধ্যে বিবৃতি রেকর্ডিং, পরিচয়পত্র যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে ক্রস-ভেরিফিকেশন ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত। পদ্ধতি সম্পন্ন না করে ফেরত পাঠানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।



