ক্ষমতায় আসার চার মাস পার হলেও বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক এ দল ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) প্রতিবেদনে’ এ কথা উল্লেখ করেছে। জেএসএস ১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করেছিল।
প্রতিবেদনের মূল তথ্য
আজ বুধবার জেএসএসের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে এই প্রতিবেদন পাঠানো হয়। এ প্রতিবেদনে ছয় মাসে পার্বত্য এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়। জেএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের নীতি অব্যাহত রেখেছে।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
জেএসএসের প্রতিবেদনে উঠে আসে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রসঙ্গ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাঙামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ছিল পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে বাঙালি সম্প্রদায়ের নির্বাচিত সংসদ সদস্য (চট্টগ্রাম-৫) মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ছিল চুক্তির মূল স্পিরিটের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরানোর দাবি করলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আরও উদ্বেগজনক যে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ১০২ দিনের মাথায় নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে দীপেন দেওয়ানকে ১ জুন পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর এখনো পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে কোনো জুম্মকে (পাহাড়ি) নিয়োগ করা হয়নি। বর্তমানে পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘন করে বিএনপি সরকার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়কে পরিচালনা করছে।’
মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৫৪ জন জুম্ম বা পাহাড়ি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড়ে ছয় মাসে ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। জেএসএস বলেছে, সংঘটিত ৫৭টি ঘটনার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ২৪টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে কমপক্ষে ৪৫ জন লোক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন।
জেএসএস বলেছে, ৫৭টি ঘটনার মধ্যে ইউপিডিএফ (প্রসিত), মগপার্টি খ্যাত মারমা লিবারেশন পার্টি, বমপার্টি খ্যাত কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের মাধ্যমে ১২টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে ২ জনকে হত্যাসহ ২৭ জন ব্যক্তি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, হত্যা, গুলিতে আহত, তল্লাশি, হত্যার হুমকি, টাকা ও মুঠোফোন ছিনতাই, চাঁদা দাবি ইত্যাদি ঘটনার ছিল।
নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা
৫৭টি ঘটনার মধ্যে নারী ও শিশুর ওপর ১১টি সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে ১৩ জন জুম্ম নারী ও শিশু মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। জেএসএসের সহ–তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা এ প্রতিবেদন পাঠান।



