সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান ও অনলাইন পোর্টাল চট্টগ্রাম প্রতিদিন-এ মাস্তুল ফাউন্ডেশনকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করে, প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্য ও অভিযোগসমূহ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং যথাযথ তথ্যসূত্রবিহীন, যা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এক দশকের বেশি সময় ধরে স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারি বিধিমালা এবং এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর আইন মেনে পরিচালিত হয় তাদের সব কার্যক্রম। ডেইলি সানের প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিভ্রান্তিকর অভিযোগের বিপরীতে মাস্তুল ফাউন্ডেশন তাদের দাপ্তরিক অবস্থান তুলে ধরে।
নিবন্ধন ও আইনি বৈধতা
মাস্তুল ফাউন্ডেশন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং এনজিওবিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে বিশেষ এসআরও সনদ প্রাপ্ত হওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত যেকোনো দান বা যাকাত দাতার জন্য আয়কর রেয়াত হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল মানবিক কাজও পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর নিয়মিত অডিট রিপোর্ট শেয়ার করছে।
মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি (এমআরএ) কর্তৃক নিবন্ধিত মাস্তুল ফাউন্ডেশনের ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি সরকারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এমআরএ (সনদ নং: ২০২১০০১৪৮৩) থেকে নিবন্ধিত এবং তাদের নিয়মাবলীর অধীনে পরিচালিত। প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও শোষণহীন সমাজ গড়তে মাস্তুল ফাউন্ডেশন এই ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের (এমআরএ) অনুমোদনপ্রাপ্ত এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো ‘কর্জ-এ-হাসানা’ বা সুদমুক্ত ঋণ। এর মাধ্যমে অসচ্ছল ও পরিশ্রমী মানুষদের ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে।
স্বতন্ত্র আর্থিক কাঠামো
যাকাত তহবিল এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম—এই দুটির প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো সম্পূর্ণ পৃথক। যাকাতের অর্থ শরীয়াহ নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দুটি ফান্ডের মধ্যে কোনো অর্থ মিশ্রণের সুযোগ নেই। মাস্তুল ফাউন্ডেশনের ‘যাকাত তহবিল’ এবং ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স’ কার্যক্রম দুটি সম্পূর্ণ পৃথক প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোতে পরিচালিত হয়। যাকাতের অর্থ কেবল শরীয়াহ নির্ধারিত খাতে (এতিমখানা, মাদ্রাসা, বৃদ্ধাশ্রম, মেহমানখানা, যাকাত স্বাবলম্বী প্রকল্পে) ব্যয় হয়।
স্বচ্ছতা ও অডিট
প্রতিবছর স্বনামধন্য নিরপেক্ষ অডিট ফার্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করা হয়। বাৎসরিক অডিট সকল দাতা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সদস্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হয় এবং অডিট রিপোর্টগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হয়।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রম
ফিলিস্তিনের গাজায় ও সুদানে প্রেরিত মানবিক সহায়তার প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘সরকারের সকল বিধি ও নীতিমালা’ অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যথাযথ চিঠিপত্রের মাধ্যমে সব তথ্য অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দূতাবাস (এম্বাসি) থেকে প্রাপ্ত অফিসিয়াল ‘মানি রিসিট’ সংরক্ষিত আছে।
পরিচালনা পর্ষদ
মাস্তুল ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পরিষদ ‘রেজিস্টার অফ জয়েন্ট স্টক’ (আরজেএসসি) কর্তৃক সোসাইটিতে অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত। জয়েন্ট স্টকে জমা দেওয়া নিবন্ধিত নথিপত্রে পর্ষদের সকল সদস্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, তাদের পদবী এবং নিয়োগের প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আইনগতভাবে যোগ্য যে কেউ পর্ষদে থাকতে পারেন। যদি পর্ষদের গঠন আরজেএসসি কর্তৃক স্বীকৃত হয়, তবে তাকে ‘ফ্যামিলি ডমিন্যান্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করা আইনত ভিত্তিহীন। পর্ষদে থাকা প্রত্যেক সদস্য নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এবং সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
ডেইলি সানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডেইলি সানের প্রতিবেদনে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে আর্থিক বা প্রশাসনিক অনিয়মের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার কোনো সত্যতা নেই। তারা আরও জানায়, ডেইলি সানের সংবাদকর্মী আমিনুল, রাশেদুল ও শামিম তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে বিভিন্নভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের ইঙ্গিত দেন, যা অপ্রীতিকর ও হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছে। মিথ্যা সংবাদটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে ডেইলি সানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
এ ধরনের ভিত্তিহীন ও মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এসব মিথ্যা অপপ্রচার শুধুমাত্র মাস্তুল ফাউন্ডেশনকে নয় বরং এর সঙ্গে জড়িত হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং অসহায় মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে, ডেইলি সান কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে এই মিথ্যা সংবাদ প্রত্যাহার করবে এবং সত্য প্রকাশে সচেষ্ট হবে।



