সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের একটি হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের স্বার্থে এ বিষয়ে তার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন।’
মমতার দাবি ও প্রতিক্রিয়া
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, কাকে দিয়ে খুন করিয়েছে, কার কার নাম বেরিয়ে ছিল, সবটাই তিনি জানেন। মমতার এমন মন্তব্যকে ঘিরে বাংলাদেশে ফের আলোচনায় শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড। এনিয়ে রাজধানীতে মশাল মিছিলও করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। সেই মিছিলে সংগঠনটির সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের স্লোগান দিয়েছেন, ‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা।’ অর্থাৎ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত তাদের নাম বলতে মমতার নাম ধরে স্লোগান দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ
শরীফ ওসমান হাদির বড় ভাই শরীফ ওমর হাদির অভিযোগ, তার ভাইয়ের হত্যার সঙ্গে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীরা জড়িত। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদির খুনের সঙ্গে ইন্টেরিম সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি ও মন্ত্রী সরাসরি জড়িত। এছাড়া হাদি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামায়াতের একজন পিএস জড়িত’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
অপরদিকে ওসমান হাদির বোন মাসুমা হাদি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং কার অনুমতি নিয়ে আবদুল্লাহ আল জাবের এই হত্যা মামলার বাদী হলেন?’ একইসঙ্গে মাসুমা হাদি তার ভাইয়ের চিকিৎসা, মামলার বাদী হওয়া নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তি এবং পরিবারের বিরুদ্ধে চলা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে নানা ‘বিস্ফোরক’ তথ্য সামনে এনেছেন।
রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া
‘হাদির মৃত্যুতে যারা লাভবান হয়েছেন, তারাই তাকে নিয়ে রাজনীতি করছেন’—এমন মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনীতিবিদরা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওসমান হাদি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। যার কারণে তাকে শহীদ হতে হয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আগেও আমাদের দলের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। আমরা চাই যে বা যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সরকার তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করুক।’
ওসমান হাদির হত্যা নিয়ে কারা রাজনীতি করছে এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কারা রাজনীতি করছে সেটা জানি না, তবে মমতার তৃণমূল এবং বিজিপি যে রাজনীতি করেছে তা স্পষ্ট। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের ভীত যে কতটা দুর্বল তা লক্ষ্যে করা গেছে।’
হান্নান মাসউদ আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি করাটাও একটা মেসেজ যে, খোদ প্রধানমন্ত্রী কতটা অনিরাপদ, তা এর মধ্যে দিয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে। এদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি জোরদার না থাকে, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের কথা আর কী বলবো। দেশের প্রতিটি মানুষ এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়। আমরা চাই, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবার সরকার বিচার নিশ্চিত করুক।’
গণঅধিকার পরিষদের বক্তব্য
শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা বিশেষ গোষ্ঠীও জড়িত বলে সন্দেহ করেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘যারা মূলত হাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লাভবান হয়েছে— তারাই হাদিকে নিয়ে রাজনীতি করছে। হাদিকে নিয়ে এখন তারা ব্যবসাও শুরু করেছে। অথচ হাদি জীবদ্দশায় সবসময় ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন।’
ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি
শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় জড়িত দেশীয় খুনিদের চিহ্নিত করা, পলাতক খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখনও পর্যন্ত ওসমান হাদির বিচারের ব্যাপারে কোনও ধরনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করতে পারেনি। আগামী শুক্রবারের মধ্যে সরকার যদি হাদি হত্যাকারীদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য বা তাদের বিচার নিশ্চিত করতে সময়সীমা দিতে না পারে, তাহলে জনগণকে নিয়ে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।’
জাবের বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল, সেই বক্তব্য আমলে নিয়ে এর সত্য-মিথ্যা ঘটনা উদ্ঘাটন করা। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বললেন যে, পরাজিত প্রার্থীর কোনও কথা তাঁরা আমলে নিচ্ছেন না।’
ইনকিলাব মঞ্চ এখন চূড়ান্ত আন্দোলনের দফা বা আলটিমেটাম দেবে বলেও জানান তিনি। আগামী সাত দিনের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট দুটি কথা শুনতে চান বলে জানান তিনি। আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘প্রথমত জাতিসংঘের অধীনে একটি তদন্ত হওয়ার কথা ছিল। জাতিসংঘ তদন্তের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে নাকি তারা বারণ করে দিয়েছে, এটা আমরা সরকারের কাছ থেকে শুনতে চাই।’
‘দ্বিতীয়ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে এটা সুস্পষ্ট যে, হাদি হত্যায় ভারত ও বাংলাদেশের যোগসূত্র রয়েছে। তাই আমি মনে করি, সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে কীভাবে এই খুনের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা যায়, সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
পরিবারের অবস্থান
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন তার বোন মাসুমা হাদি। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং কার অনুমতি নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এই হত্যা মামলার বাদী হলেন, তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে।’



