নরসিংদী শহরের নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলার ঘটনার সহযোগী শাহিনারা বেগম (৫২) নামের আরেক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ওই এলাকার মৃত আবদুল আজিজের স্ত্রী।
ঘটনার বিবরণ
এর আগে গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলেন মোহাম্মদ আলী (২৫) নামের একজন তরুণ। প্রাণীর ওপর নির্মমতার ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই তরুণকে নাগরিয়াকান্দি এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর এখন কারাগারে রয়েছেন তিনি।
মামলা ও গ্রেপ্তার
পুলিশ বলছে, নরসিংদী মডেল থানার উপপরিদর্শক নোমান সাদেকিন অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী ও মো. রমজান মিয়া নামের দুজন তরুণের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২৯/৩৪ ধারায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও দু-তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে রমজান পলাতক। গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আলী (২৫) নরসিংদী শহরের কামারগাঁও এলাকার কসাইপাড়ার আবদুর রবের ছেলে। মামলার অপর আসামি রমজান মিয়া (২০) একই এলাকার হারুন মিয়ার ছেলে।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়া
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘এনিমেল কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার অব বাংলাদেশ’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। ওই ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, বুধবার বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে খালি গায়ে থাকা একজন ব্যক্তি আরও কয়েক ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি কুকুরের গলায় রশি লাগিয়ে, রশির অপর প্রান্তে ইট বাঁধছেন। পরে নিষ্ঠুরভাবে ওই কুকুটিকে মেঘনা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে নরসিংদী মডেল থানা–পুলিশ তাঁদের আটক করতে অভিযান চালায়।
মোহাম্মদ আলীর জবানবন্দি
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, প্রায়ই কুকুরটি উপদ্রপ করত ও কামড় দেওয়ার চেষ্টা করত। এ কারণে কুকুরটিকে নাগরিয়াকান্দি সেতুর ওপরে নিয়ে আসেন তিনি। পরে সহযোগীদের সহায়তায় কুকুরের গলায় রশি বাঁধেন আর রশিটির অপর প্রান্তে ইট বাঁধেন। এরপরই কুকুরটিকে নদীতে ফেলে দেন তিনি। গলায় ইট বাঁধা থাকায় ওই কুকুর তীরে উঠতে না পেরে পানিতেই মারা যায়।
পুলিশের বক্তব্য
নরসিংদী মডেল থানার উপপরিদর্শক নোমান সাদেকিন বলেন, মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে ঘটনার সহযোগীরা শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন নারী আজ সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। রমজানসহ অন্য আসামিরা পলাতক। তাঁদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের ভূমিকা
‘এনিমেল কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার অব বাংলাদেশ’ ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি আপলোডের পর তা চোখে পড়ে জেলা ছাত্রদল সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের (নাহিদ)। তাঁর বাড়িও শহরের নাগরিয়াকান্দি এলাকায়। তিনি নিজের কর্মীদের অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলীকে ধরে আনার জন্য বলেন। বিকেলে তাঁকে নাগরিয়াকান্দি সেতুতে নিয়ে আসা হলে শত শত মানুষের সামনে ‘আমরা মানুষ, আমরা যেন পশু না হই’ বলিয়ে কানে ধরে ওঠবস করানো হয়। পরে থানায় কল করে ঘটনা জানালে উপপরিদর্শক নোমান সাদেকিন সেখানে গিয়ে মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করেন।
শাহিনারা বেগমের ভূমিকা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার শাহিনারা বেগমের কামারগাঁওয়ের বাড়িতে আরও কয়েকটি কুকুরের সঙ্গে পানিতে ডুবিয়ে মারা কুকুরটিও থাকত। তবে এই কুকুরটি ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। খুব উপদ্রপ করত, কামড়ে দিতে উদ্যত হতো। এতে বিরক্ত ছিলেন বাড়িটির সদস্যরা। একপর্যায়ে শাহিনারা বেগম পাশের বাড়ির মোহাম্মদ আলীকে অনুরোধ করেন এই কুকুরকে সরিয়ে নিতে। এরপরই মোহাম্মদ আলী কয়েকজনকে নিয়ে কুকুরটিকে নিয়ে নাগরিয়াকান্দি সেতুতে যান।
ভিডিওতে দৃশ্য
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, খালি গায়ের তরুণ মোহাম্মদ আলী নাগরিয়াকান্দি সেতুর ওপরে একটি জীবন্ত কুকুরসহ অবস্থান করছেন। কুকুরের গলায় রশি দিয়ে বাঁধা। রশির অপর প্রান্তটিতে বাঁধা একটি আস্ত ইট। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন নারীসহ তিনজন ব্যক্তি। এ সময় মোহাম্মদ আলী রশিটির ইটের প্রান্ত পাশে থাকা এক ব্যক্তির হাতে দেন এবং নিজে কুকুরটি তুলে নেন। পরে দুজনই একসঙ্গে কুকুর ও রশি বাঁধা ইট নদীতে ফেলে দেন। নদীতে পড়ার পর কুকুরটি অসহায়ভাবে তাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল। একপর্যায়ে ওই কুকুর নদীতে ভেসে যেতে থাকে।



