রেড নোটিশ: পলাতকদের জীবন, আইনের ফাঁক ও বাস্তবতা
রেড নোটিশ: পলাতকদের জীবন, আইনের ফাঁক ও বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতে ‘ইন্টারপোল’ এবং ‘রেড নোটিশ’ শব্দ দুটি অত্যন্ত পরিচিত, কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। সাধারণ মানুষ রেড নোটিশকে সিনেমার গল্পের মতো কল্পনা করলেও, এটি আসলে একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা বা ‘গ্লোবাল অ্যালার্ট’, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জানিয়ে দেয় যে কোনো ব্যক্তি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হয়ে পলাতক রয়েছেন।

ইন্টারপোলের প্রকৃত ভূমিকা

হলিউড-বলিউডের সিনেমায় ইন্টারপোলকে দেখা যায় বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের পেছনে ছুটতে, কিন্তু বাস্তবে সংস্থাটির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই, নেই গ্রেফতারের ক্ষমতা। তাদের কাজ হলো সদস্য দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। ১৯৫টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত এই সংস্থা আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শনাক্ত, অবস্থান নির্ণয় এবং গ্রেফতারে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করে।

রেড নোটিশের বাস্তবতা

রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়। কাউকে গ্রেফতার করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর। এই কারণেই রেড নোটিশ থাকা সত্ত্বেও অনেক পলাতক বছরের পর বছর বিশ্বের নানা প্রান্তে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের কতজন নাগরিক বর্তমানে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের আওতায় রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ্যে জানা যায় না। ইন্টারপোলের প্রকাশ্য রেড নোটিশ তালিকায় বর্তমানে বাংলাদেশের ৫৯ জনের নাম দেখা যায়। এই তালিকায় রয়েছেন হত্যা, সন্ত্রাস, মানবপাচার, প্রতারণা, জাল নোট চক্র, পর্নোগ্রাফি, আন্তর্জাতিক চোরাচালান, আত্মসাৎ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা মামলার আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি রাতুল আহমেদ বাবু ও মাওলানা তাজউদ্দিন আহমেদ, শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন খান, কালা জাহাঙ্গীর, জিসান আহমেদ, চন্দন কুমার রায়, খোরশেদ আলম ও গিয়াস উদ্দিন, আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী সিরাজ মোস্তফা লালু, জাফর ইকবাল এবং মোল্লা নজরুল ইসলাম, জাল নোট চক্রের সদস্য আজিজুর রহমান, অজয় বিশ্বাস, তরিকুল ইসলাম ও আবদুল আলীম শরিফ, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত জাহিদ হোসেন খোকন এবং মডেল তিন্নি হত্যা মামলার আসামি গোলাম ফারুক অভি। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি নুর চৌধুরী, কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, শরীফুল হক ডালিম, মোসলেহ উদ্দিন খান, রাশেদ চৌধুরী এই তালিকায় রয়েছেন।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন আবেদন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ চাওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির তথ্য প্রকাশ্যে আসে। একই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের আবেদন করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খানসহ সাবেক বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের বিরুদ্ধেও রেড নোটিশ চাওয়ার উদ্যোগ নেয়।

বাংলাদেশ পুলিশের সূত্র মতে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এনসিবি অন্তত ২৮ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করলেও ইন্টারপোল মাত্র চার জনের বিরুদ্ধে তা জারি করে। সংস্থাটির সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা বর্ণগত চরিত্রের কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করেছে।

পলাতকদের জীবনযাত্রা

রেড নোটিশ থাকা সত্ত্বেও পলাতকরা কীভাবে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করেন? এর কারণগুলো হলো:

  • রেড নোটিশ কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়, অনেক দেশ এটিকে গ্রেফতারের স্বয়ংক্রিয় ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে না।
  • রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা প্রাপ্তি গ্রেফতার ও প্রত্যর্পণকে জটিল করে তোলে।
  • অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই।
  • সব রেড নোটিশ প্রকাশ্য নয়, ফলে সীমান্ত ও বিমানবন্দরে তথ্য বিনিময়ের কার্যকারিতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

পলাতকদের শ্যাডো ওয়ার্ল্ড

পুলিশ সদর দফতরের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন পলাতক থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের টিকে থাকার জন্য একটি ‘শ্যাডো ওয়ার্ল্ড’ তৈরি করেন। তারা গোল্ডেন পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব ক্রয় করে নতুন পরিচয় নিয়ে ভ্রমণ ও বসবাসের সুযোগ পান। যেসব দেশের সঙ্গে নিজ দেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, সেসব দেশকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধী প্লাস্টিক সার্জারি, ভুয়া নথি বা বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে নজরদারি এড়ান। অর্থ লুকিয়ে রাখতে অফশোর কোম্পানি, ট্যাক্স হেভেন এবং জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেন, যাতে আর্থিক লেনদেন ট্র্যাক করা কঠিন হয়।

ভূ-রাজনীতি, আশ্রয় এবং আইনের ফাঁক

অনেক সময় পলাতক ব্যক্তি নিজ দেশে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার দাবি করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সুবিধা নেন। আশ্রয়দাতা দেশ যদি সেই দাবি গ্রহণ করে, তাহলে তাকে ফেরত পাঠানো সহজ হয় না। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক বা কূটনৈতিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পলাতক ব্যক্তি হয়ে ওঠেন কূটনৈতিক দরকষাকষির অংশ। ফলে আইনের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতিও নির্ধারণ করে রেড নোটিশের তালিকায় থাকা একজন পলাতকের ভবিষ্যৎ।

বেনজীর প্রসঙ্গ: গ্রেফতারের পর কী?

বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেফতারের খবর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। তবে গ্রেফতার আর প্রত্যর্পণ এক বিষয় নয়। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনিরের মতে, শক্তিশালী আইনি নথি, পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনি প্রক্রিয়া, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ এবং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর।

রেড নোটিশের অদৃশ্য চাপ

বাইরে থেকে পলাতকদের জীবন যতই বিলাসবহুল মনে হোক, বাস্তবে তারা এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করেন। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আধুনিক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি, বায়োমেট্রিক যাচাই এবং বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডারের কারণে যেকোনো সময় তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাদের অনেকেই নিজের নাম ব্যবহার করতে পারেন না, স্বাভাবিকভাবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সতর্ক থাকতে হয়। আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় আসে নিজেদের ভেতর থেকেই—পুরস্কারের লোভ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা ব্ল্যাকমেইলের কারণে ঘনিষ্ঠ সহযোগী বা নিরাপত্তারক্ষীরাই তাদের ধরিয়ে দেন।

রেড নোটিশ সবসময় পলাতকের শেষ গন্তব্য নয়, আবার এটি কেবল প্রতীকী সতর্কবার্তাও নয়। বরং এটি এক ধরনের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ছায়া, যা একজন ব্যক্তির আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, ব্যাংকিং, ব্যবসা, ভিসা এবং আইনি অবস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রেড নোটিশের নয়, প্রশ্ন হলো—কোন দেশ তাকে খুঁজছে, কোন দেশ তাকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং কোন দেশ তাকে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত। অনেক সময় সেই ভূ-রাজনীতি, কূটনীতি ও আইনের জটিল ত্রিভুজেই নির্ধারিত হয়, রেড নোটিশভুক্ত কোনো পলাতক ব্যক্তি পাঁচতারা হোটেলের লবিতে বসে কফি খেতে থাকবেন, নাকি একদিন হঠাৎ কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাতকড়া পরবেন।