প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ নতুন রেলপথের রুট অপরিবর্তিত
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের রুট অপরিবর্তিত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিরাজগঞ্জ–বগুড়া নতুন রেলপথের রুট পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম রেলপথটি বগুড়া শহরের পরিবর্তে গাবতলী উপজেলা পর্যন্ত নেওয়ার জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব আমলে নেননি।

প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও ব্যয় বৃদ্ধি

বর্তমান সরকার সিরাজগঞ্জ–বগুড়ার মধ্যে নতুন ৭৬ কিলোমিটার মিশ্র গেজ (মিটারগেজ ও ব্রডগেজ) রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। এই রেলপথ নির্মাণ হলে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ার দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার কমে যাবে এবং যাত্রার সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে আসবে। বর্তমানে ঢাকা থেকে ট্রেন সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর হয়ে সান্তাহার দিয়ে বগুড়া শহরে যায়। নতুন রেললাইন হলে ট্রেন সিরাজগঞ্জ থেকে কামারখন্দ, রায়গঞ্জ, শেরপুর, শাজাহানপুর ও কাহালু হয়ে বগুড়া শহরে যাবে।

প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদন পায়। ভারতীয় ঋণের অর্থে এটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতীয় সরকার প্রকল্পে অর্থায়ন না করার কথা জানিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভারত সরে যাওয়ার পর এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) অর্থায়নে রাজি হওয়ায় প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত করা হচ্ছে। সংশোধন প্রস্তাবটি এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিমন্ত্রীর প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, নতুন রেলপথটি সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ার রানীরহাট হয়ে বগুড়া শহর পর্যন্ত যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চেয়েছিলেন, নতুন রেলপথটি বগুড়া শহর অবধি না নিয়ে রানীরহাট থেকে শহরের বাইরে দিয়ে গাবতলী উপজেলা পর্যন্ত যাবে। এর ফলে ১৫ কিলোমিটার বাড়তি রেলপথ নির্মাণ করতে হতো।

বিষয়টি নিয়ে ১ জুন প্রতিমন্ত্রী রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি বলেন, নতুন রেলপথটি বগুড়া শহরের ভেতর না নিয়ে গাবতলী নিয়ে গেলে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। বর্তমানে কাহালু থেকে বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে গাবতলী পর্যন্ত রেলপথ রয়েছে, যা তিনি উঠিয়ে ফেলার অনুরোধ জানান।

প্রতিমন্ত্রীর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যমান রেলপথটি ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে এবং এতে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে দীর্ঘ সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে, ফলে যানজট দেখা দেয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, রেলক্রসিংগুলোর কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার ঘণ্টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা নগর ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় ১৬ জুন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনে এবং তাঁর পরামর্শ চায়। সব শুনে প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধ আমলে না নিয়ে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মৌখিক নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। রেলপথে পরিবর্তন আনা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।” তিনি আরও বলেন, পুরোনো রেললাইনের কারণে বগুড়া শহরে যানজটের সমস্যা আলাদা প্রকল্প করে সমাধান করা হবে এবং নতুন রেললাইনে প্রয়োজন অনুযায়ী পাতাল ও উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হবে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, বগুড়া শহরে থাকা পুরোনো রেলপথ উঠিয়ে ফেলতে গেলে স্থানীয় মানুষ বাধা দেবেন এবং শহরের ভেতর রেলের দামি জমি ও স্থাপনা পরিত্যক্ত হয়ে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়েও প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধ নাকচ করেছেন।

জমি অধিগ্রহণে ব্যয় বৃদ্ধি

প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূল ডিপিপিতে মোট ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের কথা বলা আছে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত পথনকশা নির্ধারণ ও ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করার পর প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০১ দশমিক ৭৭ একর। পরবর্তী সময়ে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসকের চূড়ান্ত ব্যয় প্রাক্কলনে এ খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। স্থানীয় পর্যায়ে জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়েছে। জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

প্রকল্পের বিবরণ

প্রকল্পের আওতায় ৮৬ দশমিক ৫১ কিলোমিটার মূল রেললাইন ও ৩৭ কিলোমিটার শাখা রেললাইন নির্মাণ করা হবে। করতোয়া নদীর ওপর ২৪৬ মিটার ও ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি বড় সেতুসহ মোট ১২১টি ছোট–বড় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা–রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেল ওভারপাস ও ঢাকা–নাটোর মহাসড়কের ওপর আরেকটি ওভারপাস নির্মাণ করা হবে।

এ পথে মোট ১১টি রেলস্টেশন থাকবে। সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, সনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাটে নতুন আটটি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর রেলস্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া রানীরহাট এলাকায় একটি ‘ওয়াই’ আকৃতির রেললাইন নির্মাণ করা হবে, যার একটি মুখ বগুড়ার দিকে, অন্যটি কাহালুর দিকে যাবে।