ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির শেষ বিদায়ে ভারতের প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্তে বিতর্ক
খামেনির শেষ বিদায়ে ভারতের প্রতিনিধি পাঠানো নিয়ে বিতর্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মধ্যে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগামী ৪ থেকে ৯ জুলাই তেহরান, কোম ও খামেনির জন্মস্থান মাশহাদে এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের প্রতিনিধি দল এবং আমন্ত্রণ

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে ভারত মোদির পরিবর্তে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা এবং বিহারের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইনকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্ত ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কোনও কূটনৈতিক অবনতি কিংবা মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বড় কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।

প্রোটোকল ও অতীতের তুলনা

২০২৪ সালে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি যখন বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন, তখন ভারতের পক্ষে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। সেই তুলনায় এবার খামেনির শেষকৃত্যে তুলনামূলক নিচু স্তরের প্রতিনিধি পাঠানোকে সম্পর্কের অবনমন হিসেবে দেখছেন সমালোচকদের একটি বড় অংশ। আবার কেউ কেউ এর সঙ্গে ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষকৃত্যের তুলনা করছেন, যেখানে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিভি নরসিমহা রাও অংশ নিয়েছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উল্লেখ্য, কয়েক দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমালোচনা ও বিশ্লেষণ

ভারতীয় আইনজীবী ও লেখক নভরুপ সিং এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "একজন রাজ্যের গভর্নরকে পাঠানোই বলে দেয় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারত কতটা আন্তরিক। স্পষ্টতই ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়া এখন আরও দৃশ্যমান। সত্যি বলতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অগ্রাধিকার গুলিয়ে ফেলেছে।"

কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি রাইসির শেষকৃত্যের তুলনায় খামেনির অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি দলের স্তর নামিয়ে আনার সমালোচনা করে বলেন, "খামেনি কেবল আধ্যাত্মিক নেতাই ছিলেন না, বরং ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন। মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত করে যে ইরান যুদ্ধে আক্রমণকারী দেশগুলোর প্রতি মোদির পক্ষপাত এখনও বজায় রয়েছে। উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি না পাঠিয়ে নয়াদিল্লি মূলত ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে অসন্তুষ্ট না করার চেষ্টা করছে।"

স্বাধীন সাংবাদিক ও লেখক সাবা নকভি একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "এটি একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত, কারণ জানা গেছে পাকিস্তান তাদের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠাচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে তেল সরবরাহসহ অনেক কিছুতেই ইরানের ভূমিকা থাকবেই। ভারত চাইলে এখনও এই প্রতিনিধি দলকে হালনাগাদ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে পাঠাতে পারে।"

সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল পবন নায়ার এটিকে প্রোটোকল লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন, যা ভারতের মার্কিন ও ইসরায়েলঘেঁষা নীতিকেই প্রকাশ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবীন সাহনি মনে করেন, "বিশ্বজুড়ে যখন শতাব্দীর বড় পরিবর্তন ঘটছে, তখন ভারত গ্লোবাল সাউথ এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার পাশে না দাঁড়িয়ে ভুল করলো। এর ফলে এ বছর ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্ব থেকেও বিশেষ কিছু আশা করা যায় না।"

ভিন্ন মত ও কৌশলগত ভারসাম্য

তবে সবাই এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক অবমাননা হিসেবে দেখছেন না। নীতি বিশ্লেষক তানভি মদন সতর্ক করে বলেন, "প্রতিনিধি দলের পদমর্যাদা দেখেই চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। ১৯৮৯ সালেও ভারত রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাউকে পাঠায়নি। হয়তো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পদের পার্থক্যের কারণে রাইসি ও খামেনির বেলায় প্রোটোকলে ভিন্নতা রাখা হয়েছে।" ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারি অবশ্য মনে করেন, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রদর্শনের জন্য এই প্রতিনিধি দল যথেষ্ট নয়।

ভারতের পররাষ্ট্র নীতি দীর্ঘদিন ধরেই স্বায়ত্তশাসন ও বহুমুখী ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সমীকরণের কারণে তেহরানের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে কিছু জটিলতা থাকলেও চাবাহার বন্দর উন্নয়ন এবং জ্বালানি রুটের মতো বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা চলমান রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারত হয়তো ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল না করার জন্য এই কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার পথ বেছে নিয়েছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে