বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তানের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র দফতরের বৈঠকে (এফওসি) দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার হয়েছে। বৈঠকের আগে নিয়মিত পরামর্শ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উভয় পক্ষ পররাষ্ট্র দফতরের পরামর্শ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
বুধবার (৮ জুলাই) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং তাজিকিস্তানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইদিবেক কালান্দার নিজ নিজ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার
উভয় পক্ষই বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা ও সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা রাজনৈতিক সংহতি আরও গভীর করার ওপর জোর দেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পারস্পরিক সফর আয়োজনের প্রস্তাব দেন। তারা সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ-তাজিকিস্তান পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে আরও বেসরকারি খাতের যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল বিনিময়কে উৎসাহিত করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক (আরএমজি), পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পসহ মূল উৎপাদন খাতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক নেতৃত্বের কথা তুলে ধরেন। এতে তাজিকিস্তানের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অন্বেষণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউসি) গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সমঝোতা স্মারক ও খনিজ সম্পদ সহযোগিতা
আলোচনার ফাঁকে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। তাজিকিস্তানের বেসরকারি খাতের একটি অনুসন্ধানমূলক মিশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাজিকিস্তানের বিপুল মজুদ এবং স্বর্ণ, অ্যালুমিনিয়াম, দস্তা, তামা, সীসা এবং রূপার ক্ষেত্রে দক্ষতাসহ খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন।
দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও খেলাধুলায় সহযোগিতা, শিক্ষার্থী, যুবক, পর্যটক ও সাংস্কৃতিক দল বিনিময় এবং বাংলাদেশ থেকে তাজিকিস্তানে উচ্চ দক্ষ ও আধা-দক্ষ পেশাদার কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগসহ জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন নিয়ে আলোচনা হয়।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
প্রতিনিধিরা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের ভিসা মওকুফ, পর্যটনের প্রসার, দ্বৈত কর পরিহার, বিনিয়োগের প্রসার ও সুরক্ষা এবং শিল্প ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে আরও কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি দ্রুত সম্পাদন করতে সম্মত হন। বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তান উভয়ই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমন্বয় গভীর করতে এবং জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করতে সম্মত হয়েছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য বাংলাদেশ তাজিকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তারা গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী নিয়েও মতবিনিময় করেন। স্থিতিশীলতা এবং আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের প্রসারে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে কৌশলগত অবস্থানকে একটি অনন্য সুযোগ হিসাবে স্বীকৃতি দেন। প্রতিনিধি দলগুলো উল্লেখ করেন যে, উদ্বোধনী আলোচনা দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের যোগাযোগের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছে। পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়সূচিতে দুশানবেতে দ্বিতীয় পর্বের পররাষ্ট্র দফতরের পরামর্শ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। আলোচনার ফাঁকে দুই দেশের কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ আবদুল মুহিত এবং তাজিকিস্তানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।



