ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের মুখোমুখি, গোপন বৈঠকে উঠল নেতৃত্বের ষড়যন্ত্র
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন সুতোর ওপর ঝুলে আছে। সোমবারই তিনি কী পদত্যাগ করতে বাধ্য হবেন? এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। এই বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও জনসমক্ষে আসেনি, তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো দাবি করছে, এটির গভীরতা অনেক বেশি।
গোপন বৈঠকের বিস্তারিত ও নেতৃত্বের লড়াই
স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা এই বৈঠককে স্রেফ উত্তর-পশ্চিমের দুই বন্ধুর আড্ডা বলে উড়িয়ে দিলেও, লেবার পার্টির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, এই আলোচনা নেতৃত্ব পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। অ্যাশটন-আন্ডার-লাইনের রেনারের নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বার্নহ্যাম একটি রূপালি রঙয়ের মার্সিডিজে করে সন্ধ্যা ৬টার কিছু আগে পৌঁছান। সূত্রের দাবি অনুসারে, তারা আগামী ৭ মের স্থানীয় নির্বাচনের অত্যন্ত গোপনীয় এবং নেতিবাচক এক অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। লেবার হাই কমান্ড থেকে ধামাচাপা দেওয়া ওই জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচনে দলটি দুই হাজারের বেশি কাউন্সিলর পদ হারাতে পারে, যা কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট।
একজন সিনিয়র লেবার এমপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রেনার স্বীকার করেছেন তার ওপর চলমান এইচএমআরসি ট্যাক্স তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সরাসরি নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামতে পারছেন না। এই স্বীকারোক্তি নেতৃত্বের পথ বার্নহ্যামের জন্য প্রশস্ত করে দিলেও একটি বড় শর্ত জুড়ে দিয়েছে। সেটি হচ্ছে, রেনার হবেন বার্নহ্যামের ডেপুটি এবং তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে হাউজিং ও লেভেলিং-আপের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।
সোমবারের পরীক্ষা ও ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি
সোমবার স্টারমার সরকারের জন্য কেবল অন্য দিনগুলোর মতো সাধারণ দিন নয়, এটি হতে পারে পতনের সূচনা। সেদিন বেলা সাড়ে ৩টায় লর্ড ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি নিয়ে হাউজ অব কমন্সে স্টারমারকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে নিয়োগ দেওয়া হলো, এটিই কেলেঙ্কারির মূলে রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হয়তো বলবেন তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। কিন্তু, নেপথ্যের খবর হলো, লেবার ব্যাকবেঞ্চাররা ইতোমধ্যে পাল্টাপাল্টি জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন। কিয়ার স্টারমার যদি বিশ্বাসযোগ্য টাইমলাইন দিতে ব্যর্থ হন, তবে ক্লাইভ লুইসের মতো বামপন্থি এমপিরা সরাসরি পার্লামেন্ট ফ্লোর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে পারেন। সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ এই দাবির পালে হাওয়া লাগতে পারে এবং পদত্যাগের দাবি তোলা এমপিদের সংখ্যা দুই অঙ্কে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, মঙ্গলবার বরখাস্ত হওয়া ফরেইন অফিস প্রধান স্যার অলি রবিন্স পার্লামেন্টারি কমিটিতে সাক্ষ্য দেবেন। তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, তিনি ‘ভয়াবহ ক্ষুব্ধ’ এবং তিনি প্রমাণ করবেন যে ডাউনিং স্ট্রিটের রাজনৈতিক চাপেই ম্যান্ডেলসনকে নিরাপত্তা ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। এই সাক্ষ্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সরাসরি বিরোধী হবে বিধায়, অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সোমবার বিকালেই পদত্যাগের ঘোষণা দিতে পারেন স্টারমার।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেনারের সাংবিধানিক পথ
সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেই উপ-প্রধানমন্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থলাভিষিক্ত হন না। তবে, দ্রুত ক্ষমতার হস্তান্তরের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে। যদি সোমবার স্টারমার পদত্যাগ করেন এবং লেবার পার্টির জাতীয় নির্বাহী কমিটি এই পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করে, তবে তারা নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে। সেক্ষেত্রে সমঝোতার মাধ্যমে অ্যাঞ্জেলা রেনারকে অন্তর্বর্তীকালীন বা পূর্ণকালীন নেত্রী হিসেবে ডাউনিং স্ট্রিটে বসানো হতে পারে।
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের লক্ষ্য কেবল দলের এনইসি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সংসদে ফিরে আসা। গোপন গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, তার আইনি দল ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে যা পাস হলে মেয়র পদে থেকেও সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথে কোনও বাধা থাকবে না।
স্টারমারের টিকে থাকার চেষ্টা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সোমবারের পরীক্ষায় কিয়ার স্টারমার টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করবেন ঠিকই। কিন্তু, তার ওপর যে প্রবল অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে তাতে তার পদত্যাগ করার সম্ভাবনা দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদি তিনি এ যাত্রায় পদত্যাগ নাও করেন, ৭ মের নির্বাচনে বড় হারের পর অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে তাকে বিদায় নিতে হবে বলে অনেকের মত। সেক্ষেত্রে মে মাসের শেষ নাগাদ অ্যাঞ্জেলা রেনারকেই ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, যেখানে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম থাকবেন তার উত্তরসূরি হিসেবে।
লেবার পার্টি থেকে হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড গ্লাসম্যান রবিবার বলেছেন, ম্যান্ডেলসনকে নিয়ে সাম্প্রতিক এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে নেতৃত্ব চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে, নিকট ইতিহাসে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের দাবি যতবার খোদ নিজ দলের ভেতর থেকেই উঠেছে, অন্য কোনও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এবারও পদত্যাগ এড়িয়ে যতদিন পর্যন্ত সম্ভব ততদিন স্টারমার টিকে থাকার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।



