ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ফেরত দিতে রাজির দাবি ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান তাদের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা 'পারমাণবিক ধুলো' ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। এই দাবি সত্য হলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে।
ইরানের নিশ্চয়তা এখনো আসেনি
তবে ইরান এখনো বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ইতিহাসে দেখা গেছে, ইরানের পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের অনেক দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ইরানের আলোচনা চলছে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আগামী মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
'পারমাণবিক ধুলো' কী?
ট্রাম্পের 'পারমাণবিক ধুলো' বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে, যা গত বছর মার্কিন বিমান হামলার পর মাটির গভীরে চাপা পড়ে আছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ জানিয়েছে, জুন মাসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর এই ইউরেনিয়াম মাটির নিচে চাপা পড়েছে। এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায় বলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি একটি বড় নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়।
ট্রাম্পের সরাসরি বক্তব্য
হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে মেরিন ওয়ানে ওঠার পথে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং তারা সেটি মেনে নিয়েছে। ইরান এটিতে রাজি হয়েছে, এবং খুব জোরালোভাবে রাজি হয়েছে। বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় মাটির গভীরে চাপা পড়া পারমাণবিক ধুলো আমাদের ফিরিয়ে দিতেও তারা রাজি হয়েছে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'ইরানের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে খুব ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।'
সামরিক পরিকল্পনা থেকে কূটনৈতিক আলোচনা
যুদ্ধবিরতির আগে ট্রাম্প মার্কিন সেনাবাহিনীকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল অভিযানের পরিকল্পনা করতে বলেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল ইরানের অনুমতি ছাড়াই বিমানে করে ইরানে ঢুকে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ধার করা। তবে এখন পরিস্থিতি আলোচনার দিকে মোড় নিয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। যদিও কোনো চুক্তি ছাড়াই তিনি ফিরে আসেন, তবে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
প্রস্তাব ও বিরোধিতা
গত সপ্তাহান্তে ভ্যান্স ইরানকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি ছিল ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখা। কিন্তু ট্রাম্প পরে বলেন তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধী। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, 'আমাদের কাছে একটি বিবৃতি আছে, অত্যন্ত শক্তিশালী বিবৃতি, যে ২০ বছর পরেও তারা পারমাণবিক অস্ত্র রাখবে না।'
আলোচনার অগ্রগতি
ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, 'ইরান একটি চুক্তি করতে চায় এবং আমরা তাদের সঙ্গে খুব ভালোভাবে আলোচনা করছি। ইরান আজ এমন কাজে রাজি হচ্ছে যা দুই মাস আগেও করতে চায়নি।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সম্ভবত আরও একটি সরাসরি আলোচনার দফা হবে, 'হয়তো এই সপ্তাহান্তেই'। তিনি ইরানের নতুন নেতাদের 'অত্যন্ত যুক্তিসংগত' বলে বর্ণনা করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যারা আগে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা করেছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সামরিক শক্তি দিয়ে পারমাণবিক হুমকি দূর করা সম্ভব নয়। কূটনৈতিক পথেই সমাধান বেশি সম্ভব। ইরান আগে বলেছিল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু বেসামরিক কাজের জন্য।
২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া চুক্তিতে ইরান ৩.৬৭ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ৩০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম রাখতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি বাতিল করে দেন। এরপর ইরান ২০২১ সালে ঘোষণা করে তারা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি শুরু করেছে।
অঞ্চলীয় শান্তি প্রচেষ্টা
ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের দাবির আগে ট্রাম্প জানান, ইসরায়েল ও লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। এটিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে যৌথ হামলার পর থেকে চলা উত্তেজনা কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
বর্তমান আলোচনাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই আলোচনার ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



