বিবিসি অনুসন্ধান: যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য নাস্তিকতা ও সমকামিতার ভান
যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য নাস্তিকতা ও সমকামিতার ভান

যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য নাস্তিকতা ও সমকামিতার ভান

বিবিসির একটি গভীর অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে, যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশী ও তাদের আইনি পরামর্শকরা নাস্তিকতা, সমকামিতা এবং শারীরিক অসুস্থতার মতো ভান করে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রতারণা শিল্পে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জালিয়াতির বিভিন্ন কৌশল শেখানো হচ্ছে।

জাহিদ হাসান আখন্দের প্রতারণার কৌশল

সম্প্রতি লন্ডনের মাইল অ্যান্ড রোড এলাকার একটি অফিসে বিবিসির একজন ছদ্মবেশী সাংবাদিকের অনুসন্ধানে এই চক্রের কার্যক্রম ধরা পড়ে। এপ্রিলের শুরুর দিকে, সাংবাদিক নিজেকে একজন বাংলাদেশি ছাত্র হিসেবে উপস্থাপন করে একটি নির্দেশনামূলক কোর্সে অংশ নেন। সেখানে জাহিদ হাসান আখন্দ নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ব্যারিস্টার হিসেবে দাবি করেন, তাকে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসকে ফাঁকি দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন।

জাহিদ আখন্দ আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য তিনটি প্রধান পথ বাতলে দেন: সমকামী, নাস্তিক বা রাজনৈতিক কর্মী সেজে উপস্থাপন করা। তার মতে, ব্রিটেনে স্থায়ী হওয়ার জন্য একজন আবেদনকারীকে এই ছদ্মবেশগুলোর যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। এই জালিয়াতির আইনি সহায়তার জন্য তিনি দেড় হাজার পাউন্ড ফি নির্ধারণ করেছেন, যার বিনিময়ে আবেদনপত্র তৈরি, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি ও মক ইন্টারভিউ নেওয়ার কাজ করা হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রমাণ তৈরির জটিল পদ্ধতি

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসকে বিশ্বাস করানোর জন্য কেবল আবেদনই যথেষ্ট নয়, শক্ত প্রমাণেরও প্রয়োজন। জাহিদ আখন্দ জানান, যদি আবেদনকারী নিজে প্রমাণ জোগাড় করতে না পারেন, তাহলে তিনি এমন ব্যক্তিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন যারা টাকার বিনিময়ে জাল নথিপত্র তৈরি করে দেবে, যার জন্য আরও দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড খরচ হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নাস্তিক হিসেবে আশ্রয় চাইলে, আবেদনকারীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামের নবীকে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়। জাহিদ আখন্দের ভাষায়, ধর্মীয় আলেমরা যখন হত্যার হুমকি দিতে শুরু করবে, তখনই নির্যাতনের প্রমাণ তৈরি হয়ে যাবে। এছাড়া, বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের নাস্তিক সংগঠনের ব্লগে অর্থের বিনিময়ে লেখালেখি করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহারের বুদ্ধিও দেওয়া হয়েছে।

সমকামী সেজে আশ্রয়: সহজ পথ

জাহিদ আখন্দ দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সমকামী সাজা অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর। তার মতে, রাজনৈতিক কারণে আশ্রয় চাইলে নিজ দেশে মামলার প্রমাণ দিতে হয়, যা কঠিন; কিন্তু সমকামিতার বিষয়টি ব্যক্তিগত হওয়ায় সফলতার হার বেশি। ভুয়া সমকামী দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে আবেদনকারীকে বিভিন্ন গে-ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সদস্যপদ দেওয়া হয়।

জালিয়াতির অংশ হিসেবে আবেদনকারীকে একজন ‘পার্টনার’ বা সঙ্গীও জোগাড় করে দেওয়া হয়, যিনি হোম অফিসকে লিখিতভাবে জানাবেন যে তারা জীবনসঙ্গী। জাহিদ আখন্দের দাবি, এসব ক্লাবে যারা যায় তাদের অধিকাংশই প্রকৃত সমকামী নন, তাই ধরা পড়ার ভয় নেই।

ভুয়া ওয়েবসাইট ও সাজানো প্রতিবাদ

বিবিসির অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, জাহিদ আখন্দ ছাড়াও আরেক বাংলাদেশি আইনজীবী ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে অসংখ্য ভুয়া আবেদন জমা দিয়েছেন, যার অনেকগুলো সফল হয়েছে। এই আবেদনগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে একইসঙ্গে ‘নাস্তিক’ ও ‘সমকামী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে এমন কিছু অনলাইন নিউজ ওয়েবসাইটের নিবন্ধ জমা দেওয়া হয়েছে, যা দেখতে হুবহু আসল সংবাদপত্রের মতো। কিন্তু ইন্টারনেট রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওয়েবসাইটটি ওই চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি তৈরি করেছিলেন। কিছু নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে যে, আবেদনকারীরা বাংলাদেশের আদালতে মামলার শিকার হয়েছেন, যদিও বাস্তবে এসব মামলার কোনো অস্তিত্ব নেই।

ব্রিটিশ হোম অফিসের কর্মকর্তারা চাইলেও এগুলো সহজে যাচাই করতে পারেন না, কারণ বাংলাদেশের আদালত ব্যবস্থা এখনো কাগজ-কলম নির্ভর। ওয়েবসাইটগুলোর নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে রয়টার্স বা বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম থেকে চুরি করা সংবাদ ব্যবহার করা হতো।

সাজানো রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও অসুস্থতার ভান

ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার জন্য কেবল ভুয়া নথিপত্রই নয়, রাজপথে সাজানো প্রতিবাদ সভা এবং শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার নাটক সাজানোর মতো গুরুতর তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অনেক আবেদনকারী প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি ওয়েবসাইটের পোস্ট ব্যবহার করেছেন, যা কেবল আবেদনের সময়কালেই সচল ছিল।

অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের উপদেষ্টারা পরামর্শ দিয়েছিলেন একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বিষণ্ণতার ভান করতে, যাতে মেডিকেল রিপোর্ট আশ্রয়ের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এমনকি একজন আবেদনকারী নিজেকে এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে প্রমাণের নাটক সাজিয়েছিলেন।

হোম অফিসের কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হওয়ার সময় কীভাবে আচরণ করতে হবে, তার জন্যও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একজন আইন উপদেষ্টা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অন্য আবেদনকারীদের কী প্রশ্ন করা হয়েছে, তার একটি নমুনা প্রশ্নপত্র দেওয়া হবে প্রস্তুতির জন্য। রচডেলের এক অনুষ্ঠানে একজন আশ্রয়প্রার্থী স্বীকার করেন, তার আইনজীবী তাকে ইন্টারভিউয়ের সময় কাঁদতে বলেছিলেন, যদিও তিনি অভিনয় করতে অক্ষম ছিলেন।

এই প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য চলমান প্রতারণার জটিল ও বিস্তৃত নেটওয়ার্কের উপর আলোকপাত করে, যা আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।