ইরানের হামলায় মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস: আরব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অবসান?
ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় কমপক্ষে ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে বহু মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর গভীর দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। এই হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উপসাগরীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক 'দাদাগিরি' আর আগের মতো টিকে নেই।
হামলার বিস্তারিত চিত্র
ইরানি হামলার পরপরই মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ভাসাভাসা ধারণা ছিল, কিন্তু এখন নিউইয়র্ক টাইমস আসল ছবি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলায় একাধিক মার্কিন দূতাবাসও আক্রান্ত হয়েছে। এই ঘটনাগুলো আরব দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তাকে 'মৌনতার সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর' হিসেবে ভেবে নিশ্চিন্তে ছিলেন। ইরানি মিসাইলের আওয়াজে এখন সেই চাদর ছিঁড়েফুঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
এই সংকটের গভীরে যেতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। ৬৩২ সালে ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ বনু হানিফা গোত্রকে পরাস্ত করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সৌদি আরবের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। ১৭৪৪ সালে দিরিয়াহ চুক্তির মাধ্যমে সৌদি ও ওয়াহাবি বংশের জোট গঠিত হয়, যা আজকের সৌদি আরবের ভিত্তি তৈরি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা শরিফ হুসেইনের মাধ্যমে আরবদের ব্যবহার করে উসমানীয় সাম্রাজ্য ভেঙে দেয়, কিন্তু সাইকস-পিকো চুক্তি ও ব্যালফোর ঘোষণার মাধ্যমে আরব ভূমি ভাগাভাগি করে নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি স্থাপনের পটভূমি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন হলে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৯০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোতে বড় বড় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই ঘাঁটিগুলো গড়ে উঠে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের হামলা ও এর প্রভাব
ইরান সাম্প্রতিক হামলায় কুয়েতের ক্যাম্প আর এফ জান, ইরাকের আল আসাদ এয়ার বেস, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল দাফরা বিমানঘাঁটিসহ কমপক্ষে ১৭টি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরান দাবি করেছে, এই ঘাঁটিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হামলা জারি থাকবে। এই পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলো বুঝতে পারছে যে যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
ইরানের হামলাগুলো মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি আরব দেশগুলোর কিছু বিল্ডিং ও হোটেলেও আঘাত হেনেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে চাইছে। ইসলামাবাদের সালিসি টেবিলে ইরান যে ১০টি শর্ত রেখেছে, তার মধ্যে একটি হলো পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া। যদি যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, তাহলে আরব দেশগুলোকে ইরানের মুখোমুখি হতে হবে, এবং রাজতন্ত্রবিরোধী চেতনায় নতুন আরব বসন্তের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। পেট্রোডলারের জোরে আরব শাসকদের আয়েশি জীবন কাটানোর দিন হয়তো শেষ হয়ে যাচ্ছে, এবং তাঁদের নতুন বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।



