বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা
বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর

বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা

বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকালে তিনি ঢাকা ত্যাগ করে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। এই সফরের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করতে চায় বাংলাদেশ সরকার।

সফরের উদ্দেশ্য ও বৈঠকের বিষয়বস্তু

প্রায় ৪৮ ঘণ্টার এই সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী এবং সম্ভাব্য বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকগুলোর আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা, ভিসা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ফারাক্কা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যু স্থান পেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, "হাসিনা আর ভারতের সম্পর্ক তো আর হবে না। এটা হচ্ছে একটা নতুন সম্পর্ক বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে।" তিনি নিজেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে দিল্লিতে যাচ্ছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মরিশাস সম্মেলন ও ট্রানজিট সফর

ভারত সফর শেষে খলিলুর রহমান ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একই ফ্লাইটে মরিশাস যাবেন। সেখানে ১১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশ নিতে তিনি পোর্ট লুইসে অবস্থান করবেন। এই প্রেক্ষাপটে সফরটিকে একটি ট্রানজিট সফর হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বিশেষ করে যেহেতু নতুন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে, স্বাভাবিকভাবেই তার ভারত সফর নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সম্পর্কের গতিপথ পরিবর্তনের ইঙ্গিত

বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মাস দেড়েকের মাথায় এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে মন খুলে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে ঢাকা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, "আমরা এটা যত খোলামেলা এবং স্পষ্টভাবে সংলাপ ও সম্পৃক্ততা থাকবে, তত কিছু চ্যালেঞ্জিং ইস্যু সমাধান করা সম্ভব হবে।" তিনি আরও যোগ করেন যে ভবিষ্যতে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হবে।

আলোচনার সম্ভাব্য ইস্যুসমূহ

  • জ্বালানি সহযোগিতা: বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল কিনেছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আরও সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
  • ভিসা সমস্যা: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের অবনতির কারণে উভয় দেশ ভিসা প্রদান সীমিত করেছিল। বাংলাদেশ বাধা-নিষেধ তুলে নিলেও ভারত এখনো পুরোদমে ভিসা দেওয়া শুরু করেনি।
  • ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন: ৩০ বছর মেয়াদি ফারাক্কার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তিটি নবায়ন বা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
  • সীমান্ত হত্যা বন্ধ: সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা বন্ধের ব্যাপারটি বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।
  • বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি: বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্পের অগ্রগতি এবং পারস্পরিক বাণিজ্য সুবিধা পুনর্বহাল করার বিষয়েও কথাবার্তা হবে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্লেষকরা এই সফরকে ভারত ও বাংলাদেশের পরস্পরকে বোঝার সফর হিসেবে বর্ণনা করছেন। এর মাধ্যমে আগামীতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষাতের পথ প্রশস্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এমজে আকবর বলেন, "দুপক্ষের মধ্যেই এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে যে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বিরাট বিঘ্ন লক্ষ্য করা গেছে, যা কারোরই উপকারে আসেনি। সুখবর হল, দুপক্ষই এখন অনুধাবন করেছে, এটা পালটানোর দরকার।"

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশ উভয় পক্ষ থেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর সেই ধারাবাহিকতার অংশ এবং টানাপোড়েন কাটিয়ে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।