ইরানে ক্ষমতার পালাবদল: সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সামরিক বাহিনী
ইরানে ক্ষমতার পালাবদল: সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সামরিক বাহিনী

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশটিতে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশই ছিল শেষ কথা। কিন্তু এখন সেই ক্ষমতা ক্রমে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাচ্ছে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা একাধিক সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

খামেনির মৃত্যু ও নতুন নেতৃত্ব

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন। তবে মোজতবা ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তার পা ও শরীরের নানা অংশে গুরুতর জখম হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে আসেননি। নিরাপত্তার কারণে আইআরজিসির সহকারীদের মাধ্যমে অথবা সীমিত অডিও লিংকের সাহায্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ মহলের দুজন রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র

বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত অন্তত তিনজন সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, মোজতবা খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাকাঠামোর শীর্ষে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়ার বদলে তার ভূমিকা এখন জেনারেলদের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (এসএনএসসি), সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর এবং ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) একটি ছোট ও কট্টরপন্থী বলয়ের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরশ আজিজি বলেন, 'গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সম্ভবত তার (সর্বোচ্চ নেতা) মাধ্যমেই চূড়ান্ত হচ্ছে। কিন্তু তিনি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নাকচ করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না। যাঁরা যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তিনি তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে যাবেন?'

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা রয়টার্সকে বলেন, 'ইরানের নেতৃত্বে মতপার্থক্য থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি এখন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় মোজতবা খামেনি একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর বদলে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন।'

শান্তি আলোচনায় প্রভাব

এই ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে শান্তি আলোচনায়ও। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছে, যেখানে মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান। এ আলোচনায় সম্পৃক্ত একজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, 'ইরানিদের মতামত জানানোর গতি বেশ ধীরস্থির। অবস্থা দেখে মনে হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো একক কাঠামো দেশটির নেই। মাঝেমধ্যে কোনো বিষয়ে তাদের মতামত জানাতে দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যায়।'

শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান কূটনৈতিক হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি সম্প্রতি যুক্ত হয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি নিজেও আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার এবং তেহরানের সাবেক মেয়র। যুদ্ধের সময়ে তিনি ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় বলয়ের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

তবে পাকিস্তানের একটি ও ইরানের দুটি সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে মূল ভূমিকায় রয়েছেন আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি, যিনি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই ইরানের মূল ব্যক্তির ভূমিকায় চলে এসেছেন।

বাধার প্রকৃত কারণ

তবে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে আসল বাধা তেহরানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে এবং ওয়াশিংটন যা দিতে চায়, তাতে তেহরানের জেনারেলরা রাজি নন। এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাধা।

এ বিষয়ে রয়টার্স ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের কর্মকর্তারা এর আগে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের নেতৃত্বে কোনো মতভেদ নেই।