যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান টার্নারের একটি ফাঁস হওয়া মন্তব্য কূটনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, ‘সম্ভবত শুধু ইসরায়েলের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নয়।’ মঙ্গলবার এই মন্তব্য ফাঁস হওয়ায় যুক্তরাজ্য সরকার ও রাজপরিবারকে অস্বস্তির মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য ফাঁস
টার্নার গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আসা যুক্তরাজ্যের কিছু শিক্ষার্থীর একটি দলের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। তাঁর ওই সময়ের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। সেখানে টার্নারকে বলতে শোনা যায়, ‘বিশেষ সম্পর্ক শব্দটি আমি সাধারণত ব্যবহার করতে চাই না। কারণ, এটি বেশ স্মৃতিবিজড়িত এবং অতীতমুখী ধারণা বহন করে। এর সঙ্গে অনেক ধরনের জটিল ইতিহাস জড়িত।’
টার্নার আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, সম্ভবত একটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সত্যিকারের বিশেষ সম্পর্ক রাখে, সেটি হলো ইসরায়েল।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রদূত মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাজ্য সরকার ও রাজপরিবার দীর্ঘদিন ধরে এ সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করে আসছে।
রাজা তৃতীয় চার্লসের সফরের প্রভাব
রাষ্ট্রদূত টার্নারের এই মন্তব্য ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং রাজা তৃতীয় চার্লসের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কিছুটা অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে টার্নারের করা মন্তব্যটি গতকাল মঙ্গলবার প্রথম প্রকাশ করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে, যখন রাজা তৃতীয় চার্লস ও কুইন কনসর্ট ক্যামিলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করছিলেন।
এপস্টিন কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ
টার্নার শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, এপস্টিন কেলেঙ্কারিতে যে যুক্তরাষ্ট্রের কারও ক্ষতি হয়নি, সেটা ভেবে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছেন। অথচ তাঁর পূর্বসূরি ম্যান্ডেলসন ও অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের মতো যুক্তরাজ্যের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা এ ঘটনার কারণে পদচ্যুত বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পিটার ম্যান্ডেলসন ও অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর—দুজনের বিরুদ্ধেই যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ সরকারি পদে থাকা অবস্থায় অসদাচরণের অভিযোগে তদন্ত চালাচ্ছে। তবে তাঁরা দুজনই জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ধরনের অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দুজন আরও বলেছেন, এপস্টিন-সংক্রান্ত নথিতে কোনো ব্যক্তির নাম থাকা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নয়।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, টার্নারের এসব মন্তব্য ‘একান্ত ও অনানুষ্ঠানিক’ ছিল, যা প্রকাশের উদ্দেশ্যে বলা হয়নি। তিনি আরও বলেন, এগুলো যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থানের কোনো প্রতিফলন নয়। তবে বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলেও টার্নার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক এখনো দৃঢ়। টার্নার বলেন, ‘আমাদের মধ্যে গভীর ইতিহাস ও পারস্পরিক টান রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।’
যুক্তরাষ্ট্র সফররত যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস গত সোমবার ওয়াশিংটনে টার্নারের সরকারি বাসভবনে একটি গার্ডেন পার্টিতে অংশ নেন। তবে রাষ্ট্রদূত মনে করেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের এ সম্পর্ক, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতের সম্পর্ককে নতুন করে ‘সংজ্ঞায়িত করা’ প্রয়োজন।



