পার্বত্য চট্টগ্রাম: আদিবাসী বিতর্কের রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা
পার্বত্য চট্টগ্রাম: আদিবাসী বিতর্কের রাজনীতি

বর্ত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। গত কিছু বছর ধরে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ মহল 'আদিবাসী' শব্দটিকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক 'আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র' (ইউএনডিআরআইপি) গ্রহণের পর থেকে এই তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে এই দাবি কেবল তাত্ত্বিকভাবে ভুল নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।

আইএলও কনভেনশন ও বাংলাদেশের অবস্থান

এসব বিষয়ে সচেতনতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার আইএলও কনভেনশন ১০৭ গ্রহণ করলেও, ইউএনডিআরআইপি এবং আইএলও কনভেনশন ১৬৯ গ্রহণ করেনি। কেন গ্রহণ করেনি, তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ঐতিহাসিক সত্যের বলিষ্ঠ ভিত্তি। জাতিসংঘ বিশ্বের বিপন্ন ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার জন্য ১৯৫৭ সালে প্রথম 'Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957' বা আইএলও কনভেনশন-১০৭ প্রবর্তন করে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আইএলও-১০৭-এ Indigenous (আদিবাসী) এবং 'Tribal' (উপজাতি) শব্দ দুটিকে আলাদাভাবে এবং বাস্তবতার নিরিখে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ তার সংবিধানে এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকে 'উপজাতি', 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা' বা 'নৃগোষ্ঠী' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই কনভেনশনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে ১৯৮৯ সালে যখন আইএলও-১৬৯ প্রস্তাব করা হয়, তখন থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। এই নতুন প্রস্তাবে আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ আইএলও-১৬৯ অনুমোদন বা স্বাক্ষর করেনি। মজার বিষয় হলো, যেসব উন্নত রাষ্ট্র আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আদিবাসী অধিকার নিয়ে সবক দেয়, তারা নিজেরাই কিন্তু এই আইএলও-১৬৯ গ্রহণ করেনি। মানবতাবাদী হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড আজ পর্যন্ত এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এশীয় দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়—ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এমনকি চীন ও জাপানও আইএলও-১৬৯ গ্রহণ করেনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইউএনডিআরআইপি ও আইএলও ১৬৯-এর ঝুঁকিপূর্ণ ধারা

জাতিসংঘের (ইউএনডিআরআইপি) ২০০৭ সালের ঘোষণা এবং আইএলও ১৬৯-এর ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। কেন বাংলাদেশ এই ঘোষণাপত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন, তার কারণ লুকিয়ে আছে এর কয়েকটি বিশেষ অনুচ্ছেদে। যেমন—

  • অনুচ্ছেদ ৩ (আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার): এই ধারার অপব্যাখ্যা করে যে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ভবিষ্যতে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তোলার আইনি সুযোগ পেতে পারে।
  • অনুচ্ছেদ ৪ (স্বায়ত্তশাসনের অধিকার): এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আরেকটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির সুযোগ করে দেয়, যা কেন্দ্রীয় শাসন ও জাতীয় সংহতিকে দুর্বল করে।
  • অনুচ্ছেদ ১০ ও ১৪ (ভূমি ও সম্পদের অধিকার): এই ধারার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন বনভূমি বা খনিজ সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়, যা দেশের সাধারণ নাগরিকের সমান অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।
  • অনুচ্ছেদ ১ (স্ব-পরিচয়ের ধোঁয়াশা): আইএলও ১৬৯-এর অনুচ্ছেদ ১-এ 'স্ব-পরিচয়' (Self-identification)-কে আদিবাসী হিসেবে গণ্য করার প্রধান মানদণ্ড ধরা হয়েছে। এই ধোঁয়াশাপূর্ণ সংজ্ঞার সুযোগ নিয়ে যে কোনো অভিবাসিত গোষ্ঠী নিজেকে 'আদিবাসী' দাবি করে রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
  • অনুচ্ছেদ ৩০: জাতীয় নিরাপত্তার জন্য 'ডেথ ট্র্যাপ' বা মরণফাঁদ: যদিও প্রচার করা হয় যে আইএলও ১৬৯ আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা করবে। কিন্তু এর অনুচ্ছেদ ৩০ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি। আইএলও ১৬৯-এর অনুচ্ছেদ ৩০ এবং ইউএনডিআরআইপি-এর একই ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সম্মতি বা অনুরোধ ছাড়া রাষ্ট্র ঐ অঞ্চলে কোনো সামরিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে না। ত্রিদেশীয় সীমান্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র যদি সীমান্ত রক্ষা বা সন্ত্রাস দমনে দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নিতে চায়, তাহলে এই 'সম্মতি'র দোহাই দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা সেনাতৎপরতা আটকে দিতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এখানে 'জনস্বার্থের' কথা বলা হলেও, বাস্তবে 'সম্মতি' না পাওয়ার অজুহাতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ববিরোধী কার্যক্রম ও বিচ্ছিন্নতাবাদ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকি।

ঐতিহাসিক সত্য: পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠী আদি বাসিন্দা নয়

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো ঐতিহাসিকভাবে এই ভূমির আদি বাসিন্দা নয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী চাকমা, মারমা, বম, রাখাইন, তঞ্চঙ্গা ও ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায়শই মূলত মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত এবং তারা গত কয়েক শ বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত থেকে অভিবাসিত হয়ে এই পার্বত্য অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। বিপরীতে, বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠী হাজার বছর ধরে এই ব-দ্বীপের ভূমিপুত্র। সুতরাং, যারা অভিবাসী হয়ে এ দেশে এসেছে, তারা 'আদিবাসী' দাবি করাটা ঐতিহাসিক সত্যের চরম অপলাপ মাত্র।

১৯৯৭ সালের চুক্তি ও বর্তমান ষড়যন্ত্র

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতেও কোথাও 'আদিবাসী' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। সেখানে 'উপজাতি' শব্দটিই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ২০০৭ সালের পর থেকে একটি বিশেষ মহল আন্তর্জাতিক ফোরামের এজেন্ডা বাস্তবায়নে 'আদিবাসী' দাবিটি সামনে নিয়ে আসে। বর্তমানে যারা নতুন করে আদিবাসী দাবি তুলছে, তারা মূলত দেশে একটি কৃত্রিম বিতর্ক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরির ষড়যন্ত্র করছে। তারা চায় আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নিতে, যাতে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, যারা কেউ জুম্মল্যান্ড, কেউ কুকি-চিন ল্যান্ড, কেউ ত্রিপুরা ল্যান্ড এবং সর্বোপরি আদিবাসী ল্যান্ড গঠনের স্বপ্নে বিভোর, তারা তাদের রাজত্ব কায়েম করতে পারে।

উপসংহার: বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের অবস্থান ও চূড়ান্ত সত্য হলো—বাংলাদেশে কোনো 'আদিবাসী' নেই। এখানে যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করছেন, তারা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তার অংশ হিসেবে রাষ্ট্র তাদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে 'আদিবাসী'র তকমা লাগিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না। আইএলও-১০৭-এর সুরক্ষা বলয় তাদের জন্য যথেষ্ট। আইএলও-১৬৯ বা ইউএনডিআরআইপি-এর মতো বিতর্কিত ও একপাক্ষিক দলিল বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। পাহাড় ও সমতলের সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের জাতীয় লক্ষ্য।

লেখক: সাংবাদিক, লেখক