মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর: কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ
মিয়ানমারের জান্তা প্রধানের ভারত সফর: কূটনৈতিক হিসাব

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান জ্যোষ্ঠ জেনারেল মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি ভারত সফর করে কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি নিজের চাওয়ামতো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন, যেখানে তাকে অভ্যুত্থানকারী জেনারেল নয়, বরং সম্মানিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে নয়াদিল্লি। বছরের পর বছর রক্তপাত ও কূটনৈতিক প্রত্যাখ্যানের পর এই পাঁচ দিনের সফর তার জন্য বড় প্রাপ্তি।

ভারতের কৌশলগত স্বার্থ

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিসাব ভিন্ন। মিয়ানমার ভারতের কাছে নৈতিকতার নয়, বরং নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের বিষয়। ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর ও মিজোরামের জন্য অস্থিরতার উৎস। এছাড়া চীন এ অঞ্চলে বিশাল প্রভাব ও অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। মোদি মনে করেন, মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে।

মিন অং হ্লাইংয়ের হিসাব

অন্যদিকে মিন অং হ্লাইংয়ের লক্ষ্য হলো মোদির উষ্ণ অভ্যর্থনার মাধ্যমে ডিসেম্বর ও জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনের পর নিজের বৈধতা ও স্বীকৃতি জোরালো করা। তবে সমস্যা হলো নয়াদিল্লি এমন একজনের ওপর ভরসা করছে, যিনি চুক্তি করতে পারলেও প্রয়োজনীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারছেন না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কালাদান প্রকল্পের বাস্তবতা

সফরে দ্বিপক্ষীয় নীতির চিরচেনা বুলি দেখা গিয়েছে—বন্ধুত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট ও ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কের মাধ্যমে যোগাযোগ উন্নয়ন। কিন্তু এই প্রকল্প এমন অঞ্চলের ভেতর দিয়ে গিয়েছে, যা বিদ্রোহীদের অধীনে। জান্তার নিয়ন্ত্রণ সেখানে নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কালাদান প্রকল্প ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মূল ভিত্তি। এটি কলকাতাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়ে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে, কালাদান নদী বেয়ে চিন রাজ্যের পালেতওয়া পর্যন্ত পণ্য পরিবহন এবং সেখান থেকে সড়কপথে মিজোরামকে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি। কিন্তু বিদ্রোহী আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, পালেতওয়া ও আশপাশের অঞ্চল নেপিদোর অধীন নয়। চিন রাজ্যের প্রতিরোধ বাহিনীর জোট ভারতের সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। সিতওয়ে বন্দর গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চারপাশের রাস্তা, নদী ও সীমান্ত এলাকা জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই।

ভারতের দ্বিধা

নয়াদিল্লি চায় মিয়ানমারের জান্তা ভারতের স্বার্থ রক্ষা করুক, কিন্তু জান্তার পদ্ধতি হলো বিমান হামলা, কামানের গোলাবর্ষণ, জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং পোড়ামাটি নীতি। এটি সীমান্তকে স্থিতিশীল না করে বরং মিজোরাম ও মণিপুরে শরণার্থী সংকট তৈরি করে।

ভারত এর আগে ১৯৪৯ সালে উ নুর সরকারকে সহায়তা দিয়েছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের ধ্বংসযজ্ঞের মূল কারিগর, যিনি অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করে ক্যু-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন।

মিন অং হ্লাইংয়ের মরিয়া পদক্ষেপ

মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর ছিল মরিয়া পদক্ষেপ। টিকে থাকার জন্য তিনি মিয়ানমারের সার্বভৌম সম্পদ নিলামে তুলছেন—চীনের সামনে কিয়াকফিউ সমুদ্রবন্দর ও মাইটসোনে বাঁধের লোভ, রাশিয়ার সামনে দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ভারতের সামনে সীমান্ত নিরাপত্তা, কালাদান প্রকল্প ও বিরল খনিজ খনির চুক্তি। কিন্তু তিনি এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যা তার সামরিক বাহিনী বাস্তবায়ন করতে পারবে না। পূর্বসূরি যেকোনো সামরিক শাসকের চেয়ে তার কম অঞ্চল ও কম বৈধতা রয়েছে।

চীনের ভূমিকা

এই সফর মিন অং হ্লাইংকে চীনের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারবে না। বেইজিং বোঝে ভারতের বৈধ স্বার্থ, তবে ভারত যদি রাখাইনে খনিজ সম্পদ বা সীমান্ত সংযোগে সুবিধা পায়, চীন তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ভারত যদি নেপিদোর মাধ্যমেই কালাদান প্রকল্প সুরক্ষিত করতে চায়, তা ব্যর্থ হবে। আর ভারত যদি আরাকান আর্মির সঙ্গে প্রভাব গড়ে তোলে, বেইজিং নিজের প্রভাবের জায়গা ব্যবহার করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ভারতের জন্য সুপারিশ

ভারতের উচিত চীনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। নয়াদিল্লির কাছে চীন যা দিতে পারে না তা হলো ফেডারেল গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা। মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী শক্তি, জাতিগত গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজ ফেডারেল শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। ভারত সেই আলোচনায় গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে সমর্থন করতে পারে।

মিন অং হ্লাইংয়ের সফর একটি ক্ষতিকর বার্তা দিয়েছে—ভারতের গণতান্ত্রিক বুলি সীমান্তেই থমকে যায়। নয়াদিল্লি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কেবল অবকাঠামোগত প্রকল্পের বাধা হিসেবে দেখে, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়। অথচ তারাই এমন পথ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা ভারতের প্রয়োজন।

ভারতের উচিত সম্পৃক্ততাকে সমর্থনের চেয়ে আলাদা রাখা। নেপিদোর সঙ্গে কথা বলা দরকার, কিন্তু একই সঙ্গে আরাকান আর্মি, চিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী, জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার ও সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে বাস্তবমুখী যোগাযোগ গভীর করা উচিত। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, আন্তসীমান্ত মানবিক সহায়তা এবং বিমান হামলা বন্ধের জন্য চাপ দেওয়া প্রয়োজন।

মোদি ও মিন অং হ্লাইংয়ের হিসাব দুটোই ত্রুটিপূর্ণ। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যতক্ষণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সততার আলোচনায় বসছে না, ততক্ষণ এই হিসাব ত্রুটিপূর্ণ থাকবে।