ভারতের আসাম রাজ্যে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হতে যাচ্ছে। গত বুধবার রাজ্যটির নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পরে প্রথম বৈঠকে ইউসিসি নিয়ে প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রস্তাবটি বিল আকারে ২৬ মে রাজ্যের বিধানসভায় পাস হবে বলে জানানো হয়েছে।
অভিন্ন দেওয়ানি আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
আসামের মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পরে রাজ্যের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা গতকাল শুক্রবার বলেন, প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সব নাগরিকের জন্য, বিশেষত নারী ও শিশুদের জন্য, আইনের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতিনীতি ও ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে তাঁদের এই বিধির আওতার বাইরে রাখা হবে।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং ‘লিভ-ইন রিলেশনশিপ’ বা বিবাহ ছাড়া একসঙ্গে বসবাসের মতো বিষয় একটি অভিন্ন আইনি কাঠামোতে নিয়ে আসা প্রস্তাবিত ইউসিসির লক্ষ্য। বিশ্বশর্মা বলেন, ‘আসামে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সবার জন্য আইনের শাসনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং সবার, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ন্যায্য অধিকারের নিশ্চয়তা দেবে।’
মুসলিম সমাজের বিরোধিতা ও উদ্বেগ
ভারতের মুসলিমদের অনেক সংগঠন এবং মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিরা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরোধিতা করে আসছেন। কারণ, তাঁরা এটিকে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য বাধা হিসেবে দেখেন। তাঁরা যুক্তি দেন এটি বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে ইসলামি শরিয়াহ আইনকে অগ্রাহ্য করে। তাঁদের মতে, মুসলিম সমাজের বিশ্বাস অনুযায়ী এসব শরিয়াহর ভিত্তিতে করা বাধ্যতামূলক। ইউসিসির সমালোচকদের মতে, একটি বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন আইন ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে লঙ্ঘন করে। এ ধরনের আইনের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের রীতিনীতি চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
‘এক দেশ এক আইন’ নীতি ও অন্যান্য রাজ্য
বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বশর্মা বলেন, উত্তরাখন্ড, গোয়া ও গুজরাট এরই মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে। আসাম এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই আইন অনুমোদন করেছে। ইউসিসি ‘এক দেশ, এক আইন’ নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার জিতে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। নির্বাচনী ইশতেহারে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি ইউসিসি বাস্তাবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতে সেখানেও ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আদিবাসীদের আইনের বাইরে রাখার কারণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে (শিডিউল ট্রাইব) এই আইনের বাইরে রাখাটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। ভারতে আদিবাসী, উপজাতি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব আইন রয়েছে। এসব আইনে হস্তক্ষেপ হলে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। যেমন ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে নিজস্ব সমাজের বাইরে বিয়ে করলে, আদিবাসী মেয়েরা জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই এসব ক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োগ করলে, আদিবাসী সমাজে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। সেই কারণে তাদের এই আইনের বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের বিস্তারিত বিবরণ
প্রস্তাবিত এই বিধির আওতায় আইনি বিয়ের বয়স নারীদের জন্য ১৮ ও পুরুষদের জন্য ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে বহুবিবাহ। ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে অনেক আদিবাসী সমাজে বহুবিবাহ স্বীকৃত এবং তা চালু আছে। এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করলে সমস্যা বৃদ্ধির শঙ্কায় তাদের আইনের বাইরে রাখা হয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও জানান, প্রস্তাবিত আইনটি স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মায়ের জন্য সমান উত্তরাধিকার অধিকার নিশ্চিত করবে। এর পাশাপাশি বিবাহিত এবং ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কে থাকা নারীরা ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, সব সন্তানের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের হেফাজত প্রাথমিকভাবে মায়ের কাছেই থাকবে। কন্যাসন্তানদের জন্য সম্পত্তির সমান অধিকার, উত্তরাধিকার, বিবাহ নিবন্ধন, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি বিষয় এই আইনের অন্তর্গত করা হবে।



