ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ভোজশালা–কামাল মাওলা মসজিদের স্থানকে সরস্বতী মন্দির বলে রায় দিলেন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। শুক্রবার হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের বিচারপতি বিজয়কুমার শুক্ল ও বিচারপতি অলোক অবস্থির ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়ে বলেন, জেলার মুসলিম সম্প্রদায় মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্য কোনো জমি দিতে সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারে। সরকারের উচিত গুরুত্বের সঙ্গে সেই আবেদন বিবেচনা করা।
রায়ের মূল বক্তব্য
রায়ে বলা হয়েছে, ভোজশালা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনা ভারতের পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ বিভাগ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) হাতেই থাকবে। তবে পূজার্চনার অধিকারী হবে শুধু হিন্দুরাই। এই রায়ের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের নামাজের অধিকার আর থাকছে না।
বিতর্কের ইতিহাস
উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের মতো ভোজশালার মসজিদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। হিন্দুদের দাবি, মধ্যপ্রদেশের মালব্য অঞ্চলের পারমার রাজবংশের রাজা ভোজের (১০১০–১০৫৫) আমলে ভোজশালায় হিন্দুদের জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর ওই মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল। সেখানে একটি সংস্কৃত শিক্ষালয়ও ছিল।
মুসলিমদের দাবি
ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের দাবি, ওটি ‘কামাল মাওলা দরগা ও মসজিদ’। আলাউদ্দিন খিলজির আমলে ভোজশালা ধ্বংস হয়। পরে দিলওয়ার খান ঘোরির সময়ে সেখানকার একাংশে মসজিদ স্থাপিত হয়। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) মতানুসারে চতুর্দশ শতকে সুফি সাধক কামালউদ্দিনের মৃত্যুর পর ওই অঙ্গনে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সেখানে মসজিদ গড়ে ওঠে, যা ‘কামাল মাওলা মসজিদ’ নামে খ্যাত।
আন্দোলন ও আদালতের নির্দেশ
অযোধ্যা আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার সময় কাশী ও মথুরার মতো ভোজশালা ধর্মস্থানের চরিত্র নির্ধারণেরও দাবি তোলে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। আন্দোলনও শুরু হয়। চরিত্র নির্ধারণের ভার পড়ে এএসআইয়ের ওপর। সেই সব প্রতিবেদন খতিয়ে দেখার পর শুক্রবার হাইকোর্টের এই রায়। এখন দেখার, মুসলিমরা এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় কি না।
এএসআইয়ের ভূমিকা
হাইকোর্টের রায়ে ভোজশালার সংরক্ষিত চরিত্রটি বজায় রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৯৫৮ সালের আইন অনুযায়ী এই স্থাপত্য সংরক্ষিত। স্থাপত্যটির সংরক্ষণের দায়িত্বও এএসআইয়ের হাতেই থাকবে।
পূজা ও নামাজের অনুমতি
অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের দাবিতে হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের সময় থেকে ভোজশালা নিয়েও তারা বিতর্ক তোলে। তখন প্রশাসন সেখানে প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুদের পূজা করার ও প্রতি শুক্রবার মুসলিম সম্প্রদায়ের নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছিল। এ ছাড়া বসন্ত পঞ্চমীর দিন সরস্বতীর আরাধনার অনুমতিও হিন্দুদের দেওয়া হয়েছিল।
প্রশাসনের অনুমতিতে এ কথাও বলা হয়েছিল, বসন্ত পঞ্চমী শুক্রবার পড়লে দুই সম্প্রদায়কেই নির্বিঘ্নে ধর্মাচরণের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। অন্যান্য দিন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে গেলেও পূজা বা নামাজের অনুমতি ছিল না।
বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তি
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট আজ এই রায় দিয়েছেন এএসআইয়ের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে। ডিভিশন বেঞ্চ শুক্রবার বলেছেন, ওই স্থানে নিরবচ্ছিন্নভাবে হিন্দুরা উপাসনা করে আসছে। কখনো সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েনি। ঐতিহাসিক সাহিত্যও প্রমাণ করে, বিতর্কিত স্থানটি সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। ওই অংশটি নিশ্চিতভাবেই সরস্বতীর মন্দির।
মুসলিমদের অধিকার বাতিল
এই রায় ভোজশালার বিতর্কিত স্থাপত্যকে হিন্দু মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করায় মুসলিমদের আর সেখানে নামাজ পড়ার অধিকার থাকছে না। এএসআই ২০০৩ সালে সেই অধিকার মুসলিমদের দিয়েছিল।
সরকারের প্রতি নির্দেশ
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, মসজিদ তৈরির জন্য উপযুক্ত জমি পেতে মুসলিমরা রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারবেন। সরকারকে সেই আরজি বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারকে ওই স্থাপত্যের চারধারের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
মূর্তি আনয়নের নির্দেশ
মামলাকারীদের দাবি, ভোজশালায় দেবী সরস্বতীর যে মূর্তি ছিল, বহু বছর ধরে তা রয়েছে লন্ডনের জাদুঘরে। সেই দাবি ঠিক কি না, তা বিবেচনা করার নির্দেশ সরকারকে দেওয়া হয়েছে। ওই মূর্তি ভোজশালায় এনে স্থাপন করার দাবিও কতটা যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য কি না, কেন্দ্রীয় সরকারকে তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।



