বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নির্বাচিত হলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি হবেন সবার সভাপতি। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনের প্রচারে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি লিখিত বক্তৃতায় তাঁর ছয়টি পরিকল্পনার প্রস্তাব তুলে ধরেন।
ছয়টি মূল প্রতিপাদ্য
সভাপতি পদে নিজের প্রার্থিতা উপস্থাপন করতে গিয়ে খলিলুর রহমান জাতিসংঘের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। নির্বাচিত হলে নিজের কর্মপরিকল্পনার ছয়টি মূল প্রতিপাদ্য তিনি চিহ্নিত করেন। ছয়টি বিষয়ের মধ্যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ঘাটতি কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জরুরি হুমকি মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন খলিলুর রহমান। নিজের দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি উদীয়মান প্রযুক্তির ন্যায়সংগত, বিচক্ষণ পরিচালনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার সুরক্ষার পক্ষে মত দেন।
বহুপক্ষবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
খলিলুর রহমানের প্রস্তাবে বহুপক্ষবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর লক্ষ্য সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বসংস্থাটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, কার্যকর করে তোলা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দুই লাখের বেশি শান্তিরক্ষীর অবদানের কথা উল্লেখ করেন খলিলুর রহমান। তিনি শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দেন। সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাসহ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোকে তিনি অগ্রাধিকার দেন।
টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টেকসই উন্নয়ন ও ২০৩০ এজেন্ডা প্রসঙ্গে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যকার বড় ব্যবধানের কথা উল্লেখ করেন। জ্বালানিনিরাপত্তাহীনতার কারণে যেন ‘উন্নয়নের হারানো দশক’ সৃষ্টি না হয়, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। এসডিজি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, অর্থায়নের ঘাটতি মোকাবিলা করা এবং তরুণ–নারী–কন্যাশিশুদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন। এই কাঠামোতে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ (এলএলডিসি), ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র (সিডস) ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর (এমআইসি) প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খলিলুর রহমান বিদ্যমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিলকে সমর্থন ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমুদ্র কার্যক্রমের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যসহ সামুদ্রিক প্রতিবেশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন।
মানবাধিকার ও উদীয়মান প্রযুক্তি
মানবাধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে মানবাধিকার–সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং মানবিক সহায়তার পরিসর সুরক্ষার কথা বলেন খলিলুর রহমান। তিনি শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দুর্দশার বিষয়টি তুলে ধরেন। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিগ ডেটার মতো উদীয়মান প্রযুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন খলিলুর রহমান। তিনি এসব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিচক্ষণ ও ন্যায়সংগত পরিচালনব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। এগুলোর সুবিধা যাতে সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা যায়, পক্ষপাত ও অপব্যবহারের ঝুঁকি কমানো যায়, সেই লক্ষ্যে তিনি এ প্রস্তাব দেন।
জাতিসংঘ সংস্কার ও পূর্ণকালীন সভাপতি
খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে সদস্যরাষ্ট্রনির্ভর সংস্কারের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। তিনি সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, ইকোসক ও শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিশনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য তুলে ধরেন। সবশেষে খলিলুর রহমান অঙ্গীকার করেন, নির্বাচিত হলে তিনি একজন নিরপেক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি হবেন সবার সভাপতি। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি জাতিসংঘ সনদ সমুন্নত রাখবেন। ছোট প্রতিনিধিদলগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেবেন। আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মতভেদের মধ্যেও ঐকমত্য গড়ে তুলতে কাজ করবেন।
নির্বাচন প্রক্রিয়া
গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনানুষ্ঠানিক ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ’ সংলাপ হয়। এখানে প্রার্থীরা নিজেদের কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে লিখিত বিবৃতি উপস্থাপন করেন। পরে প্রার্থীরা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রশ্নের উত্তর দেন। আঞ্চলিক পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি অনুযায়ী, আগামী অর্থাৎ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপের জন্য নির্ধারিত। এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের পক্ষে দেশটির বহুপক্ষীয়তাবিষয়ক বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আগামী ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদকক্ষে সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। আর ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে।



