দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলাকালে দেশটিতে গোপনে বেশ কয়েকবার হামলা চালায় সৌদি আরব। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং দুই ইরানি কর্মকর্তার বরাতে বুধবার এ খবর জানা যায়। এর আগে সৌদি আরবের এ ধরনের কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। ইরানি ভূখণ্ডে রিয়াদের সরাসরি সামরিক অভিযানের খবর এই প্রথম প্রকাশ্যে এলো।
গোপন হামলার বিবরণ
পশ্চিমা দুজন কর্মকর্তা বলেন, গত মার্চে সৌদি ইরানে একাধিক গোপন হামলা চালায়। ইরান তাদের ওপর হামলা চালানোর জের ধরে সৌদি আরবও পাল্টা হামলা চালায়। এর মাধ্যমে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো ইরানের মাটিতে সরাসরি হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। তবে সৌদি ইরানের কোন কোন স্থাপনা টার্গেট করে সেটি স্পষ্ট নয়।
উত্তেজনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
পশ্চিমা অপর এক কর্মকর্তা বলেন, মার্চের শেষ দিকে সৌদি আরব হুমকি দেয় তারা ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে। সৌদির এ হুমকি এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় পরবর্তীতে উত্তেজনা কমে। গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ইরানের সঙ্গে সৌদির এর এক সপ্তাহ আগেই উত্তেজনা কমে যায় বলে নিশ্চিত করেছেন ওই কর্মকর্তা। তবে এ ব্যাপারে কথা বলতে ইরান ও সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দুই দেশের কেউই এতে সাড়া দেয়নি।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক থাকা সৌদি আরব ঐতিহ্যগতভাবে সুরক্ষার জন্য মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে। তবে ১০ সপ্তাহব্যাপী এই যুদ্ধে মার্কিন 'নিরাপত্তা বলয়' ভেদ করে ইরান হামলা চালাতে পারায় রিয়াদ নিজেকে অনেকটা অরক্ষিত বোধ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা এখন পশ্চিম এশিয়াকে এমনভাবে গ্রাস করেছে, যার অনেক কিছুই আগে প্রকাশ্যে আসেনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামলা
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সোমবার এক প্রতিবেদনে জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানে সামরিক হামলা চালায়। তবে সৌদি আরব সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া ঠেকাতে চেয়েছে এবং তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। এর মধ্যে রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমেও যোগাযোগ চলেছে বলে জানা গেছে। তবে উত্তেজনা প্রশমনে কোনো সমঝোতা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এ অঞ্চল এবং জনগণের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির স্বার্থে উত্তেজনা প্রশমন, সংযম ও উত্তেজনা কমানোর পক্ষে সৌদি আরবের ধারাবাহিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছি।
সমঝোতা ও বিশ্লেষণ
ইরানি ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, সৌদি আরব হামলার বিষয়টি ইরানকে জানিয়েছিল। এরপর নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আরও বড় পাল্টা হামলার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশ উত্তেজনা প্রশমনে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, “সৌদি আরবের এই পাল্টা হামলা এবং এরপর সমঝোতায় আসা এটাই প্রমাণ করে যে, উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের পরিণতি হবে ভয়াবহ।” তার মতে, এটি পারস্পরিক বিশ্বাস নয়, বরং সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নেওয়ার আগেই সীমার মধ্যে রাখার অভিন্ন স্বার্থের প্রতিফলন।
ওয়াশিংটন ও তেহরান ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার আগের সপ্তাহেই সৌদি আরব ও ইরানের অনানুষ্ঠানিক ওই সমঝোতা কার্যকর হয়। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস সাড়া দেয়নি। তবে একজন ইরানি কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল শত্রুতা বন্ধ করা এবং পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করা।



