মালদ্বীপে সাংবাদিকদের কারাদণ্ডের ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
মালদ্বীপে সাংবাদিকদের কারাদণ্ডে গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের খবর প্রকাশ করায় দেশটির দুই সাংবাদিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন তাঁদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ও তাঁর এক সাবেক সহকারীর সম্পর্কের অভিযোগ নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা নিষিদ্ধ করেছিলেন দেশটির আদালত। এ আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে ওই দুই সাংবাদিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

গত বুধবার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহজাহান ও লিভান আলী নাসিরের কারাদণ্ডের ঘটনার ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়েছে। অন্যদিকে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এই সাজাকে ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটি শাস্তিমূলক প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কারাদণ্ডের বিবরণ

সাজাপ্রাপ্ত এই দুই সাংবাদিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘আদাদু’তে কাজ করেন। মালদ্বীপের রাজধানী মালের একটি ফৌজদারি আদালত গত মঙ্গলবার তাঁদের এই সাজা দেন। আদালত শাহজানকে ১৫ দিন এবং নাসিরকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে এসব সমালোচনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর মুখপাত্র মোহাম্মদ হোসেন শরিফ। তিনি বলেন, ‘এই ফৌজদারি বিচারিক প্রক্রিয়াকে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হিসেবে দেখানোর যেকোনো চেষ্টা অযৌক্তিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রামাণ্যচিত্রের পটভূমি

ঘটনার মূলে রয়েছে ‘আয়শা’ শিরোনামের একটি প্রামাণ্যচিত্র। গত ২৮ মার্চ আদাদুর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে এটি প্রকাশ করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটিতে পরিচয় গোপন রাখা এক নারী দাবি করেছেন, ৪৭ বছর বয়সী মুইজ্জুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক। তবে শুরু থেকেই তিনি এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের অভিযান

প্রামাণ্যচিত্রটি প্রকাশের ঘটনায় গত এপ্রিলে আদাদুর কার্যালয়ে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে সাংবাদিক, বিপণনকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ল্যাপটপসহ হার্ডড্রাইভ ও পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়। আদাদুর তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু তাঁর সাবেক নারী সহকারীকে গভীর রাতে ফোন করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিক শাহজাহানকে জেল দেওয়া হয়। আর প্রসিকিউটরদের অনুরোধে সোমবার ফৌজদারি আদালত ওই প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আলোচনার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, সে বিষয়ে খবর প্রকাশ করায় নাসিরকে দণ্ড দেওয়া হয়।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা

আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই আদেশে বলা হয়, সম্মানের অধিকার রক্ষায় সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী এসব অভিযোগ নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো আলোচনাই করা যাবে না। আদাদু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিচারকাজ হয়েছে গোপনে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা শেষ করা হয়েছে। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার জন্য সাংবাদিকদের মাত্র দুই ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই পাননি তাঁরা। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ‘আমাদের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই প্রথম দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রের দেশ মালদ্বীপে এই ঘটনা গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে একটি নতুন গণমাধ্যম আইন পাস হয়। এই আইনের অধীনে সরকার-সমর্থিত লোকজনের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিশনকে সংবাদমাধ্যম বন্ধ বা জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত বছর মুইজ্জুর সহযোগীরা সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। ওই সময় তিন বিচারককে অপসারণ করা হয়, যাকে সাবেক বিচারকেরা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন।

অবশ্য সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ‘আয়শা’ প্রামাণ্যচিত্রটি প্রকাশের পরেই দেশটিতে একটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই ভোটে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খান। প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচনের সময়কাল একীভূত করার সরকারি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। সমালোচকদের মতে, সরকারের ওই পরিকল্পনা দেশের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করত।

বিচারের মুখোমুখি সম্পাদকরা

আদাদুর দুই সম্পাদক হোসেন ফিয়াজ মুসা ও হাসান মোহাম্মদও এখন বিচারের মুখোমুখি। তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামি আইন অনুযায়ী ‘কজফ’ বা ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনার মামলা করা হয়েছে। এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে এক বছর সাত মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৮০টি দোররা মারার বিধান রয়েছে। গত বুধবার মালেতে রুদ্ধদ্বার কক্ষে তাঁদের বিচার শুরু হয়েছে। এ ছাড়া এই প্রামাণ্যচিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সাবেক কর্মী আয়শাত এশা আশরাফের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

মুইজ্জুর মুখপাত্র শরিফ অবশ্য এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হামলা হিসেবে মানতে নারাজ। তিনি বলেন, এই মামলাগুলোর সঙ্গে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতার আইনি অধিকার ও দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই’। শরিফ আরও দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু গণমাধ্যমকে কাজ করার অভূতপূর্ব সুযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর সরকারি নীতি পর্যালোচনার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে একটি দায়িত্বশীল, প্রাণবন্ত ও মুক্ত গণমাধ্যম আমাদের গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।’ তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন, বিরোধীদলীয় নেতা ও আইন বিশেষজ্ঞরা শরিফের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।

সাংবাদিকতার অধিকার রক্ষায় দাবি

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) আদাদুর ওপর এই পদক্ষেপকে ‘বিচার বিভাগীয় হয়রানি’ বলে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি কারাবন্দী সাংবাদিক শাহজাহান ও নাসিরের মুক্তির দাবি জানিয়েছে। মালদ্বীপ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এই সাজাকে ‘মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের যুক্তি, আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা এবং যৌক্তিকতার সাংবিধানিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সংগঠনটি আরও বলেছে, গণমাধ্যমের ওপর এ ধরনের পদক্ষেপ মুইজ্জু সরকারের আমলে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত’।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহও এই সাজার সমালোচনা করেছেন। তাঁর দল মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এমডিপি) আদাদুর সমমনা। সলিহ বলেন, সাংবাদিকদের কারাদণ্ড দেওয়ার এই ঘটনা গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো এবং জনমত স্তব্ধ করার সরকারি অপচেষ্টার ‘আরেকটি লজ্জাজনক অধ্যায়’। মালদ্বীপের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি হুসনু আল সুউদও এই কারাদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, এই পদক্ষেপ ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার নীতিকে ক্ষুণ্ণ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়।’