ক্ষমতা পরিবর্তন নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন: বিএনপির চ্যালেঞ্জ
ক্ষমতা পরিবর্তন নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। তারা আশা করে, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, নতুন সরকার সে অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করবে এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বারবার একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—শুধু সরকার বদলায়, নাকি রাজনৈতিক আচরণও বদলায়?

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক খুন, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। নিহতদের কেউ বিএনপির, কেউ জামায়াতের, কেউ আবার একই দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার। রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও ঘটনাগুলোর চরিত্র প্রায় অভিন্ন—ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা। এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদের সংকেত লুকিয়ে আছে।

গণতান্ত্রিক বিজয়ের নৈতিক অঙ্গীকার

গণতান্ত্রিক বিজয় কেবল ভোটের ফল নয়, এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকারও। জনগণ যখন কোনও দলকে ক্ষমতায় আনে, তখন তারা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয় না, রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের দায়িত্বও অর্পণ করে। কিন্তু ইতিহাস বলে, অনেক সময় বিজয়ের পরই শুরু হয় পরাজয়ের বীজ বপন। নির্বাচনের পর বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় ধারাবাহিক কলামে “বিজয়ের রক্ষাকবচ” শিরোনামে আমি লিখেছিলাম, এবং একই শিরোনামের গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলাম—যেকোনও রাজনৈতিক বিজয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের প্রতিপক্ষ নয়, ভেতরের উচ্ছৃঙ্খলতা। বিরোধী দল কোনও সরকারের পতন ঘটাতে পারে না, যদি না ক্ষমতাসীনদের আচরণ জনগণের প্রত্যাশাকে ভেঙে দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ের ধারা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা একটি পুনরাবৃত্ত দৃশ্য বহুবার দেখেছি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা দলের কিছু নেতাকর্মী রাষ্ট্রকে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, নিজেদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেন। প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটানো, স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, টেন্ডার ও ইজারা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে দলীয় পরিচয়ের ব্যবহার ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এরপর আইনের জায়গা দখল করে দলীয় শক্তি, রাজনীতির জায়গা নেয় পেশিশক্তি, আর জনগণের সমর্থনের বদলে ভয় হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়।

অতীতের শিক্ষা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

অতীতে এই সংস্কৃতির পরিণতিও আমরা দেখেছি। যেসব দল রাষ্ট্রযন্ত্র বা স্থানীয় প্রভাবকে স্থায়ী ভেবেছিল, শেষ পর্যন্ত জনগণই তাদের সেই ভুলের মূল্য বুঝিয়ে দিয়েছে। কারণ মানুষ অনেক কিছু সহ্য করলেও অন্যায়কে অনন্তকাল মেনে নেয় না। আজ ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধী দল নয়—নিজেদের তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে শৃঙ্খলিত রাখা। একইভাবে জামায়াতেরও দায়িত্ব রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সহিংসতায় পরিণত না হতে দেওয়া। গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, নির্বাচন থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি বাজার দখল, এলাকা নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার সংস্কৃতিতে রূপ নেয়—তাহলে তা আর গণতন্ত্র থাকে না, ক্ষমতার আদিম সংঘর্ষে পরিণত হয়।

দায় অস্বীকারের প্রবণতা ও প্রশ্ন

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—প্রায় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রথম প্রতিক্রিয়া দায় অস্বীকার করা। কেউ বলে এটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, কেউ প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের কথা বলে, কেউ একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। অথচ মূল প্রশ্নটি অনুত্তরিত থেকে যায়— ঘটনাগুলো ঘটছে কেন? যদি প্রতিটি হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে এত বিচ্ছিন্ন ঘটনা মিলিয়ে ধারাবাহিক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে কীভাবে? যদি অধিকাংশ সংঘর্ষ ব্যক্তিগত বিরোধের ফল হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় বারবার সংঘাতের হাতিয়ার হয়ে উঠছে কেন। দায় চাপিয়ে দেওয়া সহজ, দায় গ্রহণ করা কঠিন। কিন্তু দায়িত্বশীল রাজনীতির শুরু সেখান থেকেই।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটতে পারে, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় হতে পারে, আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরেও রক্তক্ষয়ী আধিপত্য-সংঘাত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, অনেক সময় সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে নয়, একই দলের ভেতরেই ঘটে।

এ কারণে এখনই কয়েকটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের রক্ষা করার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও আচরণবিধি কার্যকর করতে হবে। সর্বোপরি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—দলীয় পরিচয় কোনও অপরাধের লাইসেন্স নয়।

বিজয় ধরে রাখার শর্ত

বিজয় অর্জনের চেয়ে বিজয়কে ধরে রাখা কঠিন। ক্ষমতায় যাওয়ার সংগ্রাম মানুষকে জনপ্রিয় করে, কিন্তু ক্ষমতায় থেকে সংযম প্রদর্শনই তাকে ইতিহাসে সম্মানিত করে। বাংলাদেশের মানুষ আরেকটি প্রতিশোধ, দখল ও সহিংসতার চক্র দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতা আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আইনের অধীন।

আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন—বিজয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষাকবচ প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, নিজেদের কর্মীদের আইনের ভেতরে রাখা। সেই রক্ষাকবচ দুর্বল হয়ে গেলে বিজয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি