বাজেট পাসের পর বিরোধীদলের প্রতিক্রিয়া
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের পর বিরোধীদল এটির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তারা বাজেটটিকে ‘অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে বিরোধীদলের দাবি, সংসদে তাদের আপত্তি ও চাপের মুখে সরকার বাজেটের কয়েকটি ‘গণবিরোধী’ প্রস্তাব সংশোধন বা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাজিবুর রহমান
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাজেট পাসের পর সংসদ ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানান বিরোধীদলের মুখপাত্র ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা বাজেটে না ভোট দিয়েছি। কারণ, এক কথায় বলতে গেলে এই বাজেটটি অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ এবং অবাস্তবায়নযোগ্য।’
বিরোধীদলের গঠনমূলক অবস্থানের ফল
বিরোধীদলের ভাষ্য, তাদের গঠনমূলক অবস্থানের ফলেই বাজেটের কয়েকটি প্রস্তাবে পরিবর্তন এসেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, মুদিদোকানের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হয়েছে, আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের একটি বিতর্কিত বিধান বাদ দেওয়ার ঘোষণা এসেছে এবং করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে।
মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে
তবে এসব সংশোধনের পরও বাজেটের মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে মনে করছে বিরোধীদল। তাদের প্রধান আপত্তি, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার যে পরিকল্পনা করেছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। বিরোধীদলের মতে, যখন ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকেই টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে, তখন সেখান থেকে এত বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার ব্যাখ্যা সন্তোষজনক নয়।
মূল্যস্ফীতি ও ঋণ নীতির পরস্পরবিরোধিতা
এ ছাড়া সরকার একদিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে ব্যাপক ঋণ গ্রহণ ও টাকা ছাপানোর নীতি অনুসরণ করছে—এটিকেও তারা পরস্পরবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখছে। বিরোধীদলের আশঙ্কা, এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে।
সংসদে বিল উত্থাপন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ
বাজেটের বাইরে সংসদে বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছে বিরোধীদল। তাদের অভিযোগ, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিলের কাগজপত্র তিন দিন আগে দেওয়ার কথা থাকলেও এখন যেদিন বিল উত্থাপন হয়, সেদিনই সদস্যদের হাতে নথি তুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে অর্থবহ আলোচনা ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করছে।
নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন ও আপত্তি
তবে নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইনকে যুগোপযোগী বলে স্বাগত জানিয়েছে বিরোধীদল। তাদের ভাষ্য, আইনটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। যদিও আদালতের অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার ও সার্ভার জব্দ করার বিষয়ে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়ায় তারা আপত্তি তুলেছে। এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করার বিধান থাকা উচিত ছিল বলে তাদের মত।
মেডিক্যাল শিক্ষা বিল নিয়ে আপত্তি
বাংলাদেশ মেডিক্যাল শিক্ষা-সংক্রান্ত বিল নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিরোধীদল। তাদের মতে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ আইনটি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আরও পর্যালোচনার পর সংসদে আনা উচিত ছিল। না হলে উচ্চশিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার কমিটি
সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গেও বিরোধীদল বলেছে, শুধু সংবিধান পরিবর্তন করে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য কার্যপ্রণালি বিধিসহ আরও কয়েকটি আইন সংস্কার প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে দুই সরকারি দলের পাঁচজন এবং বিরোধীদলের পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে একটি সংস্কার কমিটি গঠনের প্রস্তাব তারা দিলেও সরকার এখনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি বলে অভিযোগ করেছে দলটি।
জুলাই আন্দোলন বাস্তবায়নে বাজেটে বরাদ্দ নেই
একই সঙ্গে বিরোধীদলের দাবি, জুলাই আন্দোলন বাস্তবায়নে বাজেটে কার্যকর কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য অনুদান থাকলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আলাদা বাজেট বা সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই বলে তারা উল্লেখ করেছে।



