জামায়াত নেতার সংসদে তীব্র বক্তব্য: উন্নয়ন ও নির্বাচনের আড়ালে সংস্কার ভুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) আজ মঙ্গলবার একটি মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, উন্নয়ন ও নির্বাচন—এই দুই ইস্যুর আড়ালে বারবার মূল সংস্কারের প্রশ্ন থেকে সরে যাওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন ও নির্বাচনের নামে সংস্কার ভুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
শফিকুল ইসলাম সংসদে বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিগত দেড় বছর নির্বাচন বলে বিচার ও সংস্কারকে ভুলিয়ে দিয়েছিলাম। এখন নখের কালি (ভোটের অমোচনীয় কালি) শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে জুলাই সনদকে ভুলিয়ে দিয়েছি।’ তার এই বক্তব্য জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আনা মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় দেওয়া হয়।
জুলাই আন্দোলনের চেতনা স্মরণ ও সংস্কারের আহ্বান
জুলাই আন্দোলনের চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সন্তানেরা সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে এটা কি লিখেছিল যে আমরা একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছি? সেদিন আমাদের সন্তানেরা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে লিখেছিল—“রাস্তা সংস্কার নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে”। আমরা যেন সংস্কারের কথাটা মাথায় নিতে পারছি না। সংস্কারের পরিবর্তে আমরা এখন সংশোধনের দিকে যাচ্ছি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই সংশোধনীর জন্য তো আমাদের তরুণ-যুবকেরা, আমাদের সন্তানেরা কাজ করেনি। সংশোধনের জন্য সেদিন শেখ হাসিনাও প্রস্তাব করেছিল—২৪ ঘণ্টা দরজা খোলা আছে, তোমরা সংশোধনের জন্য আসো। সেদিন ছাত্র-জনতা সংশোধন মেনে নেয়নি, তারা সংস্কারের জন্য কথা বলেছেন। আজকে কেন সংস্কারটা মাথায় নিতে পারছি না?’
সংবিধানকেন্দ্রিক বিতর্ক ও গণভোটের ফল নিয়ে প্রশ্ন
সংবিধানকেন্দ্রিক বিতর্ক নিয়েও সমালোচনা করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনটাকে সংবিধানের ধারাবাহিকতার মধ্যে আটকে ফেলেছি। সংবিধানের দাঁড়ি-কমা, সেমিকোলন খুঁজছি। আমাদের ৩০ দিনের মধ্যে যেটা করার কথা ছিল, তা না করে খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডে গুরুত্ব দিলাম। অথচ যেটার জন্য আমরা নির্বাচন করে এখানে কথা বলার সুযোগ পেলাম, সেটার দিকে আমরা কেন নজর দিতে পারলাম না?’
গণভোটের ফল তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৫১ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছেন আর ৭০ শতাংশ জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাহলে আমরা সেই ১৭ বছরের মতো উন্নয়নের কথা বলে মূল জায়গা থেকে জনগণকে আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি? আমরা সবার আগে বাংলাদেশ তো লক্ষ করছি না। আমাদের আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার জায়গাটা এখানেই।’
স্থানীয় সরকারে বিএনপি প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিএনপি দলীয় প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক ও ৪২টি জেলা পরিষদ প্রশাসক নিয়োগে কি আমরা সরকারি দলের বাইরে একটা যোগ্য লোককেও খুঁজে পেলাম না? আমরা কি এখানে ন্যায্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে কাউকে পেলাম না? আমরা কি সেই নতুন বাংলাদেশের পথে যেতে পেরেছি? আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রশাসক নিয়োগকে গণতন্ত্রবিরোধী বললাম, আর এখন গণতান্ত্রিক সরকারের সময় নিজ দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়ে কি বলতে পারি—সবার আগে বাংলাদেশ?’
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে বিতর্ক
শেষে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে বিতর্কের উল্লেখ করে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি দল থেকে বলা হয়, আমাদের (সংবিধান সংস্কার পরিষদের) শপথ নাকি অবৈধ হয়েছে। এটা যদি অবৈধ হয়, তাহলে শপথের জন্য যারা এই সংসদে কাগজ উপস্থাপন করেছে, তাদের আগে আইনের আওতায় আনা উচিত। এই অবৈধ প্ররোচনা আমাদের কে দিয়েছেন? এই কাগজ তো আমি বাউফল থেকে নিয়ে আসিনি।’



