ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারি দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “অতীতকে স্মরণ রাখা ভালো, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াও ভালো। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা নিজেরা নতুন কোনো ইতিহাস তৈরি করতে পারব না। আসুন, ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই।”
বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রায় ৪৩ মিনিটের এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং জননিরাপত্তা বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান ও দাবিগুলো তুলে ধরেন।
সংবিধান ও রাজনীতি
বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, “অনেকে বলেন আমরা সংবিধান মানি না। সংবিধান না মানলে সংসদে এলাম কীভাবে? আমরা আইন মান্যকারী নাগরিক। কোনো কিছু পছন্দ না হলে আমরা আন্দোলন করতে পারি, কিন্তু বিদ্রোহ করব না।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে সংবিধান পরিবর্তন করে গেছেন, তা বাদ দিয়ে ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অবস্থান কীভাবে যৌক্তিক হতে পারে। এ সময় তিনি গণভোটে অনুমোদিত ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
কৃষি ও তিস্তা প্রকল্প
সরকারের কৃষিনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “গ্রামে ১০ টাকার ফসল ঢাকায় ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।” তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কারও চোখ রাঙানিকে ভয় পাবেন না। চীনের অর্থায়নে যদি সরকার এই প্রকল্প শুরু করার সাহস দেখায়, তবে ২০ কোটি মানুষ আপনাদের সমর্থন দেবে। অন্তত আমি পাশে থাকব।”
পররাষ্ট্রনীতি
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রেক্ষাপটে সরকারের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “ইরানের দুঃসময়ে কেন বাংলাদেশ পাশে নেই? কেন বন্ধুরাষ্ট্রগুলো বলছে তারা আমাদের পাশে পায়নি?” তিনি একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির দাবি জানিয়ে বলেন, “আমাদের অনেক বন্ধু দরকার, কিন্তু কোনো প্রভুর দরকার নেই। আমরা কারও শিখিয়ে দেওয়া ভাষায় নয়, নিজের ভাষায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করব।”
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা
ফ্যাসিবাদী শাসনামলের প্রতিটি গুম, খুন ও ধর্ষণের বিচার দাবি করে তিনি বলেন, “ওসমান হাদি হত্যার বিচার পর্যন্ত প্রতিটি অপরাধের বিচার হতে হবে।” এছাড়া বর্তমানে সারা দেশে চলমান চাঁদাবাজি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে ‘ফকিরের ভিক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করে জামায়াত আমির আগামী বাজেটে এই দুই খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান। তিনি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সরকারি চাকরিতে পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে।
নিজ选区র সমস্যা
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি নিজের নির্বাচনী এলাকা (ঢাকা-১৫) এর খাল দখল ও ভাঙাচোরা সড়কসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সংসদীয় কমিটি ও আলোচনার মাধ্যমে জ্বালানি সংকটের মতো সমস্যার সমাধান সম্ভব হলে, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশকেও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।



