দুদকের কৌশল বদল: বিদেশে থাকা দুর্নীতিবাজদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া
দুদকের কৌশল বদল: ইন্টারপোলের সহায়তায় বিদেশি দুর্নীতিবাজ ফেরানোর চেষ্টা

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিদেশে অবস্থানরত সাবেক ক্ষমতাধর আমলা ও আলোচিত ব্যবসায়ীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পথে চাপ বাড়াচ্ছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ অন্তত ১১ জনের বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। দুদক সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতি, অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে বিদেশে অবস্থান নেওয়া প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কৌশল বদলেছে সংস্থাটি।

বেনজীর আহমেদের গ্রেফতার: একটি মাইলফলক

ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। দুদক-সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে। পরে তাকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে বিদেশে পালিয়ে থাকা অন্য হাই-প্রোফাইল আসামিদের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া আরও জোরদার করার পথ খুলবে।

রেড নোটিশ: দ্রুত প্রক্রিয়া নয়, দীর্ঘ আইনি পথ

তবে দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, ‘রেড নোটিশ’ মানেই কাউকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া নয়। এটি মূলত একটি দীর্ঘ আইনি, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ— যেখানে আদালতের আদেশ, মামলার নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, বিদেশে সম্পদের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামো—সবকিছুর সমন্বয় লাগে। ফলে আলোচনায় ‘রেড নোটিশ’ শব্দটি যতটা দ্রুত শোনায়, বাস্তবে প্রক্রিয়াটি ততটাই জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেখ হাসিনা ও পরিবারের সদস্যরাও তালিকায়

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ইন্টারপোলে আবেদন করা ১১ জনের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। দুদক-সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিষয়ে এনসিবির মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন পাঠানো হয়েছে।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সে কারণে এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বাড়তি সতর্কতায়। আদালতের আদেশ, মামলার নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, বিদেশে সম্পদের সম্ভাব্য প্রমাণ— সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।

দুদকের সামনে চার বড় চ্যালেঞ্জ

দুদকের বর্তমান তৎপরতা উচ্চাভিলাষী হলেও সামনে রয়েছে অন্তত চারটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, রেড নোটিশ জারি হলেও সংশ্লিষ্ট দেশ তার নিজস্ব আইনি কাঠামো অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বাংলাদেশে মামলার অবস্থা শক্তিশালী হলেও বিদেশে তাৎক্ষণিক ফল নাও আসতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলে কূটনৈতিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আইনি সহায়তা এবং দ্বিপক্ষীয় সমন্বয়ই প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিদেশি আদালত বা কর্তৃপক্ষ অভিযোগের প্রকৃতি, বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে পারে।

চতুর্থত, অভিযুক্তকে দেশে ফিরিয়ে আনা আর বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার— এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রক্রিয়া। একজনকে ফিরিয়ে আনা গেলেও তার পাচার করা অর্থ বা সম্পদ ফেরত আনতে আবার আলাদা আইনি লড়াই, সম্পদ শনাক্তকরণ, জব্দ ও মালিকানা প্রমাণের প্রক্রিয়া লাগে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযোগ তুললেই হবে না— মামলার নথি শক্তিশালী হতে হবে। ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের উৎস, বিদেশি কোম্পানির মালিকানা, আদালতের পরোয়ানা, আর্থিক ট্রেইল— সবকিছুকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে তা টিকে যায়।

৫ আগস্টের পর দুদকের বার্তা কী?

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমনের ভাষা বদলেছে— এমন মূল্যায়ন করছেন দুদকের একাধিক কর্মকর্তা। আগে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তাদের অনেকেই বিদেশে থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেন। এখন দুদক সেই দূরত্ব কমাতে চাইছে— দেশের ভেতরে মামলা, আদালতের আদেশ ও সম্পদ জব্দের পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে।

দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ১১ জনের বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে যা কিছু হবে, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে।”