মেট্রো স্টেশনের বাইরে হকার-অটোরিকশার দখল, বাড়ছে যাত্রীদের ভোগান্তি
মেট্রো স্টেশনের বাইরে হকার-অটোরিকশার দখল, বাড়ছে ভোগান্তি

রাজধানীর দ্রুততম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় গণপরিবহন মেট্রোরেল। সময় বাঁচানো, নির্ধারিত সূচি এবং আরামদায়ক যাত্রার কারণে এটি ঢাকাবাসীর আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে স্টেশনের বাইরের পরিবেশ দিন দিন সেই স্বস্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে। প্রবেশ ও বহির্গমন পথ দখল করে বসেছে হকার, ফুটপাতজুড়ে জমেছে অস্থায়ী দোকান, আর সড়কে নামার পথ আটকে থাকছে অটোরিকশা। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে যাত্রীদের ভোগান্তি।

স্টেশনজুড়ে হকারদের দখল

রাজধানীর বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, স্টেশনের সিঁড়ি বা লিফট দিয়ে নেমেই যাত্রীদের পড়তে হয় হকারদের দোকান ও ক্রেতাদের ভিড়ের মধ্যে। ব্যাগ, বই, শরবত, শিঙাড়া-সমুচা, ফল, সবজি, আলু-পেঁয়াজ, আদা-রসুন, আটা-ময়দাসহ নিত্যপণ্যের দোকান বসেছে স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথজুড়ে। কোথাও আবার মুরগির দোকান, এমনকি স্টেশনের সামনেই মুরগি জবাই ও কাটাকাটির কাজ চলতে দেখা যায়। এতে পরিবেশ যেমন অস্বাস্থ্যকর হচ্ছে, তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে যাত্রীদের চলাচল।

যাত্রীদের অভিযোগ

মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী ও শিক্ষার্থী প্রশান্ত সরকার বলেন, ‘স্টেশনের সামনে এভাবে পথ আটকে দোকান বসানো কোনোভাবেই উচিত নয়। হকারদের কারণে যাতায়াতে সমস্যা হয়। দোকানগুলোর সামনে সবসময় মানুষের ভিড় থাকে। তাই সরকারের উচিত এখান থেকে সব হকার সরিয়ে দেওয়া।’ নিয়মিত যাত্রী তৌফিক আহমেদ বলেন, ‘ফার্মগেট স্টেশনে নামার পর সিঁড়ি কিংবা লিফট—যে পথেই বের হই না কেন, জটলার মধ্যে পড়তে হয়। স্টেশন থেকে বের হয়ে মনে হয় বাজারে এসেছি। আলু-পেঁয়াজ থেকে শুরু করে সবই পাওয়া যায়। অথচ শুরুতে স্টেশনগুলো অনেক পরিচ্ছন্ন ছিল। এখন মানুষের ভিড় আর দোকানের কারণে চলাচলই কঠিন হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে সমস্যা বাড়ছেই।’ আরেক যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু যাতায়াতের সমস্যাই নয়, স্টেশনগুলোর সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে। আমাদের কোনও কিছুর প্রতিই যেন দরদ নেই। যার যা ইচ্ছা করছে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্টেশন কর্মীদের বিরক্তি

শুধু যাত্রীরাই নন, স্টেশনের দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও এই পরিস্থিতিতে বিরক্ত। স্টেশনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, ‘হকারদের কারণে যাত্রীদের অনেক ভোগান্তি হয়। আমাদেরও বিরক্ত লাগে। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ অভিযান চালালেও সেটা স্থায়ী সমাধান হয় না। দুই-তিন দিন দোকান বসে না, এরপর আবার আগের মতোই শুরু হয়। আমাদের নিয়েই অভিযান চালানো হয়, কিন্তু কার্যকর ফল দেখা যায় না।’

অটোরিকশার দখলে পথ

স্টেশন থেকে মূল সড়কে নামার পথের আরেক বড় সমস্যা অটোরিকশার দখল। ফুটপাতজুড়ে দোকানের পাশাপাশি সারিবদ্ধ অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীদের চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় রাস্তা পার হওয়া কিংবা গন্তব্যে যেতে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মেট্রোরেলের যাত্রী জমির জাবেদ বলেন, ‘স্টেশন থেকে বের হয়ে মূল সড়কে যাওয়ার পথগুলো অটোরিকশার দখলে থাকে। তাদের কারণে হাঁটা যায় না, সহজে বের হওয়া যায় না, রাস্তা পার হতেও সমস্যা হয়। কিছু দিন সেনাবাহিনী এসে সরিয়ে দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আবার ফিরে আসে।’

উচ্ছেদ অভিযানে স্থায়ী সমাধান নেই

বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও মেট্রো স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় হকারদের দখলদারিত্ব কমছে না। অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই তারা আবার ফুটপাত ও চলাচলের পথ দখল করে ব্যবসা শুরু করেন। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগও থেকে যাচ্ছে।

ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তবে নিয়মিত অভিযান চালিয়েও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এটা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। আমরা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু অভিযানের পরও তারা আবার বসে যায়। যতই অভিযান চালাই, স্থায়ীভাবে কোনও লাভ হচ্ছে না।’ স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরে জানানো যাবে।’

পুলিশের বক্তব্য

স্টেশনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমি এক বছর ধরে বিভিন্ন স্টেশনে ডিউটি করছি। সবসময়ই দেখি স্টেশনের বাইরে এসব হকারের দোকান। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আমরা অভিযান চালাই, কিন্তু লাভ হয় না। অভিযান শেষ হলেই তারা আবার বসে যায়। এক মাস আগেও মিরপুর-১১ নম্বর স্টেশনে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি আবার আগের মতো।’

মেট্রোরেল রাজধানীর গণপরিবহনে নতুন স্বস্তি এনে দিলেও স্টেশন সংলগ্ন অব্যবস্থাপনা সেই অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। যাত্রীদের দাবি, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে মেট্রো স্টেশনগুলো ক্রমেই অস্থায়ী বাজারে পরিণত হবে, আর ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে না।