শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচিতে অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। আজ বুধবার দুপুরে সুনসান ক্যাম্পাস। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর থাকত ক্যাম্পাস, এখন সেখানে যেন পিনপতন নীরবতা। পথঘাট, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন, পাঠদানের কক্ষ, গ্রন্থাগার—সবখানেই এক ভুতুড়ে পরিবেশ।
অচলাবস্থার কারণ
শিক্ষকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব কার্যক্রম। কর্মবিরতি, শাটডাউন এবং সর্বশেষ সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির কারণে বন্ধ আছে পাঠদান, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কাজ। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতা
আন্দোলনরত শিক্ষকেরা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে তাঁরা পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ এপ্রিল মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জামাল উদ্দিন আমরণ অনশন শুরু করেন। ২৩ ঘণ্টা অনশনের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে পরদিন তিনি অনশন ভাঙেন। তবে আন্দোলন থামেনি; এরপর কর্মবিরতি ও শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম।
শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ২৩ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন আন্দোলনরত শিক্ষকেরা। সেখানে কেবল চলমান ফাইনাল পরীক্ষাগুলো নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিলেও নতুন ক্লাস বা অন্য পরীক্ষা নিতে অস্বীকৃতি জানান তাঁরা। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন শিক্ষকেরা। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল হয়ে যায়।
একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে মারাত্মক সেশনজটের আশঙ্কা আছে। তাঁদের দাবি, করোনা মহামারি, উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনসহ নানা কারণে আগে থেকেই শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে অনেকেই ছয় মাস থেকে এক বছরের সেশনজটে আছেন। নতুন করে এই পরিস্থিতি তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাজীব বলেন, ‘আমাদের ব্যাচ আগেই কিছুটা পিছিয়ে ছিল। ১৬ এপ্রিল ফরম পূরণ করেছি। এখন পরীক্ষা কবে শুরু হবে, জানি না। এভাবে চললে আমরা আরও পিছিয়ে যাব, বড় সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা আছে।’
শিক্ষকদের অভিযোগ
আন্দোলনরত শিক্ষকদের অভিযোগ, ২০২৪ সাল থেকে অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করলেও উপাচার্য তা বাস্তবায়ন করছেন না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি চিঠির অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের। এতে ডিগ্রির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। শিক্ষকেরা জানান, ২৫টি বিভাগে শিক্ষকসংকট থাকা সত্ত্বেও ৫১টি অনুমোদিত পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে তাঁরা ‘প্রশাসনিক ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের হস্তক্ষেপ চান।
উপাচার্যের বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুল কাইউম বলেন, ২৫টি বিভাগের বেশির ভাগেই মাত্র তিন থেকে চারজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে। অনুমোদিত ৪০১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে আছে ২৬৬টি পদ। এর মধ্যে ৫১ জন শিক্ষক দীর্ঘদিন শিক্ষা ছুটিতে আছেন। খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ভাতা দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ধীমান কুমার বলেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আপগ্রেডেশন বোর্ডের সভার পরপরই সিন্ডিকেট সভা হয়ে থাকে এবং বোর্ডের সুপারিশ দ্রুত কার্যকর হয়। কিন্তু উপাচার্য মোহাম্মদ তৌফিক আলম বোর্ডের সুপারিশ অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে পদোন্নতিপ্রত্যাশীদের জন্য আপগ্রেডেশন বোর্ডের সভাও আয়োজন করা হচ্ছে না বলে দাবি তাঁর।
উপাচার্য তৌফিক আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলমান আছে। তবে শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে। সংকট সমাধানে মন্ত্রণালয় বা ইউজিসিতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও শিক্ষকেরা তাতে সাড়া দেননি। উপাচার্য আরও দাবি করেন, কিছু শিক্ষক নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতির আবেদন করেছেন। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



