পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ঠাকুরনগরে মতুয়া–তীর্থ হরিচাঁদ–গুরুচাঁদ মন্দিরছবি: প্রথম আলো। ঠাকুরবাড়ি টইটম্বুর যতটা ভক্তিভাবে, ততটাই গমগমে ভোট–ভাবনায়। মতুয়া মনে আজ এ এক অদ্ভুত দোলাচল। এ যেন শ্যাম ও কুলের মধ্যে একটা বাছার মতো ধর্ম সংকট। কী করবে মতুয়ারা? দিশাহীন চিত্তের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে মতুয়া মন।
ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্য ও রাজনীতি
বাঙালির প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ হলেও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার চরাচরজুড়ে ঠাকুরবাড়ি হলো হরিচাঁদ–গুরুচাঁদের আশ্রয়। উনবিংশ শতকের গোড়ায় বর্ণপ্রথায় দীর্ণ বাঙালি সমাজের তলানিতে আশ্রয়প্রাপ্ত চণ্ডাল, দলিতদের সামাজিক উত্তরণের দিশা দেখিয়েছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২–১৮৭৮)। তাঁর দেহাবসানের পর তাঁরই দেখানো পথে এগিয়ে পুত্র গুরুচাঁদ (১৮৪৬–১৯৩৭) নমশূদ্র সম্প্রদায়কে জোটবদ্ধ করার আন্দোলন প্রসারিত করেন। ছড়িয়ে দেন শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো। অস্পৃশ্যতা ঘোচাতে প্রচার করেন প্রেম ও ভক্তির বাণী। হরিচাঁদের স্পর্শে বেড়ে ওঠা মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রেম–ভক্তির প্রবাহ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি থেকে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে যায়।
দেশভাগের আগে যাঁরা যশোর পেরিয়ে চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাঁরাই গড়ে তোলেন ঠাকুরনগর। বেনাপোল–পেট্রাপোল সীমান্তের এপাশে বনগাঁ পেরিয়ে মতুয়ারা যেখানে গড়ে তুলেছে তাদের ঠাকুরবাড়ি, সুবিশাল মন্দির, সেটাই আজকের ঠাকুরনগর। সেখানেই তল্লাটজুড়ে হরিচাঁদ–গুরুচাঁদের নামে নানা স্থাপনা ভোট আবহে এখন গমগম করছে। মতুয়া সম্প্রদায় হরিচাঁদ–গুরুচাঁদে একাত্ম। অথচ পরিবারের দুই শিবিরের বিভক্তির জাঁতায় পিষে মরছেন তাঁরা। কোন পক্ষে কার অবস্থান সেই ভাবনায় বিভোর।
হওয়ারই কথা। কেননা, ঠাকুরবাড়ির এক পক্ষ ঝুঁকে রয়েছে বিজেপির দিকে। নরেন্দ্র মোদির প্রতি মোহমুক্তি যাঁদের ঘটছে–ঘটছে করেও ঘুচছে না। অন্য পক্ষ আশ্রয় নিয়েছে তৃণমূলেশ্বরী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোলে, যিনি বোঝাচ্ছেন, নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার ‘মোদি–গ্যারান্টি’ স্রেফ ভোটে জেতার ভাঁওতা।
মোদির মতুয়া মন জয়
মতুয়া মন জিততেই ২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে গিয়েছিলেন। হরিচাঁদ–গুরুচাঁদের মন্দিরে মাথা ঠেকিয়েছিলেন। মতুয়া মন জেতার সেটা ছিল সহজতম উপায়। তার দুবছর আগে, ২০১৯ সালে পাস করা হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা ‘সিএএ’, যেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয়ভাবে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিষ্টান, জৈন ও পার্সিদের ভারত নাগরিকত্ব দেবে। যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে পালিয়ে এসেছেন, তাঁরা এই আইনে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী। বিপুল আলোড়ন তুলেছিল ওই আইন। বিতর্কেরও জন্ম হয়েছিল। সরকার কিন্তু পিছু হটেনি। ২০২৪ সালে আইনটি কার্যকরও হয়। তবু মতুয়া মন বিক্ষিপ্ত। কারণ, আইন কার্যকর করার গতি শামুককেও লজ্জায় ফেলবে। ঠাকুরবাড়ি চত্বরে থোকা থোকা জটলাতেও এই দোলাচল। বিজেপি না তৃণমূল, কাকে বাছবে মতুয়ারা? কার ওপর ভরসা রাখবে? মোদি না মমতা? চাঁদপুর থেকে সপরিবারে আসা অচিন্ত্য বিশ্বাস এই প্রশ্নে হাঁ হয়ে চেয়ে রইলেন। সনাতন কার্ড নেড়েচেড়ে খানিক পরে নিচুস্বরে বললেন, ‘মোদি প্রধানমন্ত্রী। কিছু করলে তিনিই করবেন। মমতার হাতে তো নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষমতাই নেই।’ নতমস্তকে বাক্যটি শেষ করে তিনি চোখ তুললেন। চশমার ঘষা কাচের মধ্য থেকে ভেসে আসা সেই দৃষ্টিতে অসহায়ত্বের ছোঁয়া। বোঝা গেল, মতুয়াদের কাছে মোদিই এখনো অন্ধের যষ্ঠি।
দেদার বিক্রি হচ্ছে ‘মতুয়া সদস্য কার্ড’ছবি: প্রথম আলো। এই বাড়ির এক শরিক মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরের ছোট ছেলে শান্তনু ঠাকুর এখন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী। বন্দর ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব তাঁর। বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্র থেকে জেতা শান্তনুর বড় ভাই সুব্রত ঠাকুর গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক। বিজেপি এবারও তাঁকে প্রার্থী করেছে। দুই ভাইয়ের বাবা মঞ্জুল কিন্তু রাজনীতিতে এসে মমতার হাত ধরে তৃণমূলে ঢুকেছিলেন ২০১১ সালে। তিন বছর পর তিনি ঢুকে যান বিজেপিতে। মঞ্জুলকৃষ্ণের বড় ভাই কপিলকৃষ্ণ। ২০১৪ সালে তৃণমূলের টিকিটে বনগাঁ কেন্দ্র থেকে তিনি লোকসভা ভোটে জেতেন। কিন্তু পরের বছর মারা যাওয়ায় উপনির্বাচনে জেতেন তাঁর স্ত্রী মমতাবালা। মঞ্জুলকৃষ্ণ ও কপিলকৃষ্ণের পরিবার এখন বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে বিভাজিত। মমতাবালা রাজ্যসভা সদস্যা। তাঁর কন্যা মধুপর্ণা এবার বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী। ঠাকুরবাড়িকে তিনি রাজনীতির আখড়া করে তুলতে চাননি। যদিও শান্তনু–সুব্রত ঠাকুরবাড়িকেই করে তুলেছেন বিজেপির হেডকোয়ার্টার্স। হুস হুস করে দলের নেতাদের গাড়ি ঢুকছে বেরোচ্ছে। নেতারা ঘন ঘন মিটিং করছেন। কর্মীদের নানা ধরনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। শান্তনু–সুব্রতদের বাড়ি, পার্টি অফিস সর্বত্র ভিড়ে ভিড়াক্কার। অথচ সামান্য তফাতে মমতাবালার বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। তৃণমূলের পার্টি অফিসও তালাবদ্ধ। কোথাও কারও উপস্থিতি নেই। ঠাকুরবাড়িকে শরিকি রাজনীতির লড়াইয়ের আখড়া করে তুলতে অনাগ্রহী মমতাবালা ডেরা বেঁধেছেন বাগদায়।
নাগরিকত্বের জটিলতা
ঠাকুরবাড়িতে বিশাল গাছের ছায়ায় একের পর এক টেবিল পেতে বিলি হচ্ছে মতুয়া মহাসংঘের সদস্য কার্ড। সদস্যদের সিএএতে নাগরিকত্ব পেতে ফরম পূরণে সাহায্য করা হচ্ছে। হাজার টাকার বিনিময়ে। সেখানেও ভ্রম ও বিভ্রান্তির একশেষ। নাগরিকত্বের আবেদনের ফরম পূরণ মানে স্বীকার করে নেওয়া, আমি ভারতের নাগরিক নই। ফলে নাগরিক অধিকার মুখ ফেরাবে। আধার কার্ড অর্থহীন হয়ে যাবে। রেশন পাওয়ার অধিকার হারাব। আমি স্টেটলেস লোক হয়ে যাব। দেশহীন। পরিচয়হীন। এই সব প্রশ্নে বিচলিত হচ্ছে মতুয়া মন। হচ্ছে, কারণ, দেদার বাতিল হচ্ছে নাগরিকত্বের আবেদন। লক্ষাধিক মতুয়া নাগরিকত্বের আবেদন জানালেও ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রাপকের সংখ্যা মাত্র ৭২। পরবর্তী তিন সপ্তাহে সারা দেশে সিএএতে নাগরিকত্ব পাওয়া লোকের সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ২০০।
গাইঘাটা, বনগাঁ, চাকদা, রাণাঘাট, বসিরহাট, বারাসাত থেকে শয়ে শয়ে মতুয়া এসেছেন ঠাকুরবাড়ি। মন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে প্রসাদের অপেক্ষায় বেলা একটায় ভোগ বিতরণ। বসিরহাটের অসীম মণ্ডলের মুদি ও মনিহারি দোকান মন্দ চলে না। নাগরিকত্বের আশায় ঠাকুরের কাছে প্রার্থনার শেষ নেই তাঁর। কিন্তু বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো চেপে বসেছে নতুন উদ্বেগ। এসআইআরে নাম কাটা গেছে তাঁদের। স্বগতোক্তির মতো শোনাল অস্ফুটে বলা তাঁর কথাটা, ‘আমার কোনো দেশ নেই, এই যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে এতকাল ধরে। এবার ভোটের অধিকারও গেল। মোদি–গ্যারান্টিতে কী করে বিশ্বাস রাখব?’ বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বাদ গেছে ৩৭ হাজার ভোটারের নাম। ৯০ শতাংশই মতুয়া। যাঁরা এখনো ‘বিবেচনাধীন’, ট্রাইব্যুনালের রায়ের অপেক্ষায়, এক সুতায় ঝুলছে তাঁদের ভাগ্য। অসীমের স্ত্রী তন্দ্রার স্বর জড়তাহীন। ‘আমাদের হয়ে দিদিই শুধু লড়লেন। একা। অন্যরা চুপ। যা কিছু প্রতিবাদ দিদিরই।’
এত মতুয়া নাম বাদ যাওয়া কাকে হাসাবে? ক্ষুব্ধ মতুয়া মন কার প্রতি সদয় হবে? তীর্থের কাকের মতো চেয়ে আছে দুই পক্ষই।



