আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সূচনা
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা হলো আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার সংসদে এই অধ্যাদেশটি পাস করিয়ে আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নতুন প্রশ্ন
যদিও অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ হয়তো আবার স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কথাও প্রচলিত ছিল যে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তি দেওয়ায় শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়নি, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আইন সংসদে পাস হওয়ার পর থেকেই সিদ্ধান্তটি নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তির জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠছে—কোনও ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে, শাস্তিও হতে পারে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, শেখ হাসিনাসহ অনেকের বিরুদ্ধে রায়ও হয়েছে, বহু নেতা-কর্মী কারাগারে রয়েছেন। তাহলে ব্যক্তির অপরাধের দায়ে একটি পুরো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কতটা ন্যায়সঙ্গত?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাস্তবতা
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ঘটনায় বিএনপি নিজেই একসময় আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করেছিল। এখন সেই বিএনপিই একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলো। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি কার্যত একটি ‘নির্ঝঞ্ঝাট’ রাজনৈতিক পরিবেশ উপভোগ করছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে, আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কি কোনও নীরব বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে? উভয়পক্ষই কি নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করার কৌশল হিসেবে আপাতত আওয়ামী লীগকে রাজনীতির বাইরে রাখতে চায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করল। একটি দলের কিছু সদস্য অপরাধ করতে পারে—তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সেই যুক্তিতে পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা হলে ভবিষ্যতে অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। বিএনপি সরকার এভাবে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বৈচিত্র্য
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্যানভাস বেশ বৈচিত্র্যময়। এখানে চরম বিপর্যয় বা বেকায়দা থেকে রাজনৈতিক দলের রাজপথে ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার বহু নজির রয়েছে। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের পর আওয়ামী লীগ, অথবা আশির দশকে এরশাদ পতনের পর বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো এর বড় প্রমাণ। একমাত্র ব্যতিক্রম মুসলিম লীগ—যারা দেশভাগের নেতৃত্ব দিয়েও পরবর্তী সময়ে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে পারেনি। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে ফিরে আসার জন্য কখনোই নিজেদের বেশি সংশোধন বা সংস্কার করতে হয়নি; বরং পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতা ও চরম অপশাসনই তাদের জন্য প্রত্যাবর্তনের লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে যদি সেই ঐতিহাসিক স্কেলে বিচার করতে যাই, তবে দেখা যাবে—সমীকরণটি আর আগের মতো সহজ নয়। ১৯৯০-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক হলেও বাস্তবে এটি দলগুলোর ধারাবাহিক অধঃপতনের ইতিহাস। কোনও দলেই সুস্থ অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র না থাকায় ইতিবাচক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গড়ে ওঠেনি। বরং প্রতিটি সরকার তার পূর্বসূরির চেয়ে বেশি মাত্রায় অপশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৯১ থেকে শুরু হওয়া এই প্রবণতা ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের আগে পর্যন্ত জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
এই ধারাবাহিকতার প্রেক্ষাপটে বলা যায়—তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও একই ধারা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে, কারণ বিএনপির ভেতরেও কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কার দৃশ্যমান নয়। তবে আওয়ামী লীগের জন্য বাস্তবতা এবার ভিন্ন। তারা মাঠে থাকুক বা না থাকুক, আগামী সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ডই অবধারিতভাবে শেখ হাসিনার শাসনামলের সঙ্গে তুলনা করা হবে। ফলে বিএনপি সরকারকে এক অদৃশ্য ‘আওয়ামী লীগ’ বা ‘ছায়া প্রতিপক্ষ’র সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপির মতো দলগুলো কখনো সহযোগী, কখনো চাপ সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এই জটিল রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় যদি তারেক রহমান ব্যর্থ হন, তবে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান সময়ের ব্যাপার মাত্র হয়ে দাঁড়াবে। তবে আরেকটি বাস্তবতা হলো—বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে আওয়ামী লীগের জন্য অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের কোনও প্রতিনিধিত্ব নেই (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা সংসদ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়)।
ভোটব্যাংক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবর্তন
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে এমন কিছু অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে, যা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ‘ভোট ব্যাংক’র কাঠামোয়। একসময় দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি-আওয়ামী লীগ এই দুই মেরুতে বিভক্ত ছিল। বিএনপির ভোটব্যাংক মূলত গঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগবিরোধী বিভিন্ন শ্রেণির ভোটারদের নিয়ে—স্বাধীনতার পক্ষের আওয়ামী-বিরোধী অংশ, ধর্মীয় রাজনীতিতে আকৃষ্ট জনগোষ্ঠী, এবং একাত্তরের বিরোধী শক্তির সমর্থকরা।
কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর এই সমীকরণ ভেঙে গেছে। ধর্মীয় রাজনীতিতে আকৃষ্ট অংশের একটি বড় অংশ এবং স্বাধীনতাবিরোধী ভোটব্যাংক বিএনপির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম—যারা পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনকে গুরুত্ব দেয় না—তারা বিএনপির প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এই শূন্যতা পূরণ করেছে আওয়ামী ঘরানার একাংশ, যারা রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে নতুন সমীকরণে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই সমর্থন স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ফলে ভবিষ্যতে তাদের পুরোপুরি আবার আওয়ামী লীগের ছায়াতলে ফিরে আসা অনিশ্চিত।
আওয়ামী লীগের সামনে চ্যালেঞ্জ
আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তারা একচ্ছত্রভাবে মাঠ শাসন করেছে। তাদের সামনে দৃশ্যমান বিরোধী দল ছিল ‘বাই ডিফল্ট’ কেবল বিএনপি। কিন্তু আগামী দিনের রাজনৈতিক মাঠে আওয়ামী লীগের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঠে এখন কেবল বিএনপি নয়, সুসংগঠিত জামায়াতে ইসলামী আছে, পাশাপাশি এনসিপির মতো দলগুলোও ভাগ বসাবে। বিএনপি যখন বিরোধী দলে ছিল, তারা কেবল সরকারের দমন-পীড়ন ও মার খেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যদি মাঠে নামতে চায়, তবে তারা কেবল পুলিশ বা সরকারের দিক থেকেই নয়, ইতোমধ্যে মাঠে থাকা অন্যান্য শক্তিশালী দলগুলোর পক্ষ থেকেও প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হবে।
দেশের একেক অঞ্চলে একেক ধরনের আওয়ামী-বিরোধী মেরুকরণ তৈরি হবে। বিএনপি দীর্ঘ দেড় দশক নির্যাতন, নিপীড়ন, গুম ও খুন সহ্য করেও টিকে ছিল কারণ তাদের তৃণমূলের সঙ্গে জনগণের এক বড় অংশের সহানুভূতি ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগকে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, যা পূর্বের যেকোনো গুম বা খুনের চেয়েও কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অচ্ছুত হয়ে পড়ার এই ধাক্কা সামলানো দলটির জন্য এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
সাংগঠনিক ভাঙন ও অন্তর্কোন্দল
আওয়ামী লীগের ভেতরের সাংগঠনিক ভাঙন ও অন্তর্কোন্দল হবে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে আরেকটি বড় অন্তরায়। আগামী দিনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে:
- দেশী আওয়ামী লীগ: যারা শত প্রতিকূলতা, মামলা ও হামলা মাথায় নিয়ে দেশে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে এবং থাকবে।
- বিদেশি আওয়ামী লীগ: যারা দলের সুসময়ে বিপুল অর্থবিত্ত বানিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে এবং সেখান থেকে রিমোট কন্ট্রোলে দল চালাতে চাইবে।
এই দুই ধারাকে কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় বিন্যস্ত করা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে চরম আদর্শিক দ্বন্দ্ব, চরম আক্ষেপ ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতির বিরুদ্ধে ত্যাগী কর্মীদের ক্ষোভ। এই দুই ধারার পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও বিরোধ নিয়ে আগামী দিনে অসংখ্য ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচিত হবে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের ‘মার্সিয়া ক্রন্দন’ শোনা যাবে। এই অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনীতিকে আরও দীর্ঘকাল পঙ্গু করে রাখতে পারে।
রাজনীতির রহস্যময়তা ও সম্ভাবনা
তবে বাংলাদেশের রাজনীতি অত্যন্ত জটিল ও রহস্যময়। এখানে শুধু জনসমর্থন দিয়ে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল পরিচালিত হয় না। এদেশের রাজনীতিতে অলৌকিক সব ঘটনা ঘটে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত। লন্ডনে ‘নির্বাসিত জীবন’ থেকে ফিরে তিনি আবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, এটা কি কেউ কখনও কল্পনা করতে পেরেছিল? সব হিসাব সমীকরণ পাল্টে দিয়ে আওয়ামী লীগও দেশের রাজনীতিতে কোনও একদিন আবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তু সেই ‘কোনও একদিন’ আসলে কবে—এই প্রশ্নের উত্তর আজ কারোরই জানা নেই। কারণ, তারা যে গভীর খাদে পড়েছে, তা থেকে ওঠার কোনও রেডি-মেড সহজ রাস্তা ইতিহাসের পাতায় অন্তত লেখা নেই!
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট



