শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা: ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে উদ্বেগ
শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা: ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ

আধিপত্য বিস্তার ও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হঠাৎ করে অস্থির হয়ে পড়েছে দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গত কয়েক দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। মূলত ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

উত্তেজনার সূত্রপাত

একে অপরকে বিভিন্ন নামে ট্যাগিংয়ের কারণে উত্তেজনার সূত্রপাত। শিবিরকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে ছাত্রদলের দেয়াল লিখন, আর ছাত্রদলকে ‘খাম্বা’ ও ‘চাঁদাবাজ’ বলে শিবিরের মিছিলের কারণে দু’পক্ষ একাধিকবার হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ধারালো অস্ত্র।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষ

গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদলের গ্রাফিতি নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ক্যাম্পাসের দেয়ালে লেখা ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’ গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। দুই দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে স্থানীয় ওয়ার্ড শিবির সভাপতি আশরাফুল ইসলামের পায়ের একটি গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শাহবাগ থানায় সংঘর্ষ

এর রেশ ধরে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিমূলক ফটোকার্ড তৈরি করা নিয়ে শাহবাগ থানায় আবারও সংঘর্ষ হয় দু’পক্ষের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে কটূক্তির অভিযোগ ওঠে ডাকসু নির্বাচনে হল সংসদ নির্বাচনে শিবিরের প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত সদস্য প্রার্থী মাহমুদের বিরুদ্ধে। তবে তার অভিযোগ, ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সন্ধ্যায় তিনি শাহবাগ থানায় জিডি করতে যান। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এতে তাদের আটকে রাখা হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাদের উদ্ধার করতে যান ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের ও সাহিত্য সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে মোহাম্মদসহ আরও কয়েকজন। তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়। এতে মারধরের শিকার হন জুবায়ের ও মোসাদ্দেক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাংবাদিক। যদিও ছাত্রদলের সিনিয়র নেতারা তাদের উদ্ধার করেন। ঘটনার খবর পেয়ে শাহবাগ থানায় ছুটে যান ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। দু’পক্ষই পরস্পর পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ছাত্রদল সভাপতি শিবিরের আহতদের গাড়িতে তুলে হাসপাতালে পাঠান।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজে উত্তেজনা

সর্বশেষ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক হলে সিট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। লটারি ছাড়াই কক্ষ বরাদ্দের অভিযোগে অধ্যক্ষের কক্ষে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অবস্থানের পর ছাত্রদলের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও পাল্টাপাল্টি মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। এতে স্বচ্ছতা ধরে রাখার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা

একই দিন পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ। কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষে জড়ায় দু’পক্ষ। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও শোডাউন করেছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির।

ফেসবুকেও ‘বাগযুদ্ধ’

শিবির ও ছাত্রদলের মারমুখী অবস্থানের চিত্র শীর্ষনেতাদের ফেসবুকেও ফুটে উঠেছে। কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তারা নিজেদের আইডি থেকে শেয়ার দিচ্ছেন। একে অপরকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। আনছেন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এ জিএস এস এম ফরহাদ ফেসবুক পোস্টে বলেন, “যতই উসকানি দেওয়া হোক, ক্যাম্পাসে কোনও সন্ত্রাসীদের ঠাঁই হবে না।” একই ধরনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। অপরদিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনদের নিয়ে উসকানির জন্য শিবিরের ‘বট আইডি’র কথা উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস সালাহ উদ্দিন আম্মারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

রাজনৈতিক নেতাদের উদ্বেগ

প্রধান দুইটি ছাত্র সংগঠনের সাম্প্রতিক উত্তেজনায় রাজনৈতিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এটি একটি অশনি সংকেত। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ক্যাম্পাসে এই দুই সংগঠনের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থির হওয়া কারও জন্যই কাম্য হওয়া উচিত নয়। অবশ্যই এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।” বিএনপির নেতা ও সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “একটি ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে গুপ্ত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তারা ছদ্মনামে আবাসিক হলে নিজেদের নেতাকর্মীদের স্থান দিয়েছে। আর ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বট আইডি দিয়ে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের কারণেই সাম্প্রতিক অস্থিরতা।” বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায়। এটি এখনই থামাতে না পারলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। আশা করি, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।”

শিক্ষাবিদদের মতামত

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে সবপক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সবাইকে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সোচ্চার হতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষাঙ্গনে যেকোনও অস্থিরতা সামগ্রিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পরতে পারে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের দুই মাসের মাথায় শিক্ষাঙ্গণের এমন অস্থিরতা দেশের জন্য অশনি সংকেত। কারণ এতে শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা বিরাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।