জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড: হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যায় হাসানুল হক ইনুর ১০ বছর কারাদণ্ড

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

গ্রেপ্তার ও তদন্তের পটভূমি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরাঞ্চল থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিভিন্ন মামলায় হেফাজতে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রসিকিউশনের তদন্ত দল ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরু করে এবং ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

বিচার প্রক্রিয়া

শুনানি শেষে গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ২২ জুন রায়ের জন্য মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করা হয়। মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আটটি অভিযোগ

প্রথম অভিযোগ: ১৮ জুলাই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাও’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে বল প্রয়োগের উসকানি ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন। দ্বিতীয় অভিযোগ: ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় সারা দেশে সেনা মোতায়েন করে কারফিউ জারি ও ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে নির্দেশ দেন। তৃতীয় অভিযোগ: ২০ জুলাই দুপুরে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে দমন ও হত্যার নির্দেশ দেন ইনু। চতুর্থ অভিযোগ: একই দিন দুপুরে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছত্রীসেনা নামিয়ে ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোম্বিং করে হত্যার পরিকল্পনায় তিনি সহায়তা করেন। পঞ্চম অভিযোগ: ২৭ জুলাই বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর’-এ আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন ইনু। ষষ্ঠ অভিযোগ: ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সপ্তম অভিযোগ: ৪ অগাস্ট বিকালে আন্দোলনকারীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি বর্ষণের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া। অষ্টম অভিযোগ: ৫ অগাস্ট কুষ্টিয়া সদর মডেল থানা এলাকায় ইনুর নির্দেশে আব্দুল্লাহ আল মুস্তাকিন (১৬), সুরুজ আলী বাবু (৪১), আশরাফুল ইসলাম (৩৭), বাবলু ফরাজী (৫৮), ইউসুফ শেখ (৫৬) ও উসামা (১৮) নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য

অভিযোগ দাখিলের দিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, “হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এবং জাসদের সুপ্রিম নেতা হিসেবে নিয়মিত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তিনি ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে স্থানীয় এসপি এবং দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিতেন।” তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও হাসানুল হক ইনুর ফোনালাপের বিশেষজ্ঞ মতামত ও ট্রান্সক্রিপ্ট দাখিল করা হয়েছে, যাতে আন্দোলনকারীদের ধরে মেরে ফেলার ইঙ্গিত এবং ‘জঙ্গি নাটকের কার্ড’ খেলার কৌশল উল্লেখ রয়েছে।

বিচারকদের মন্তব্য ও ইনুর বক্তব্য

গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল ইনুকে বলেন, তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে; তিনি ‘গিল্টি প্লিড’ করলে কাজ শেষ হবে, নয়তো বিচার শুরু হবে। জবাবে ইনু নিজেকে ‘রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার’ দাবি করে বলেন, “আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি মনে করি আল্লাহর পর বিচার নিষ্পত্তির প্রতিনিধি আপনি। আপনি ন্যায়বিচার করবেন।”

সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর কৌঁসুলি আব্দুস সোবহান তরফদারের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষী হিসেবে মেহেরপুরের বাসিন্দা রাইসুল হকের জবানবন্দির মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যপর্ব শুরু হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ৩ জন, বিশেষজ্ঞ ২ জন, ভুক্তভোগী পরিবারের ১ জন, জব্দ তালিকার ২ জন, জেলার ১ জন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষী দেন। মামলায় ২০ সিরিজের ডকুমেন্ট এবং ৫টি বস্তু উপস্থাপন করা হয়।

গত ১১ মার্চ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য দেন ইনু, যেখানে সব অভিযোগকে কাল্পনিক, বিদ্বেষপ্রসূত ও বানোয়াট দাবি করেন। গত ২ এপ্রিল ইনুর পুনর্তদন্ত ও সাক্ষী তলবের আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল। এরপর ৬ মে আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করে ইনুর খালাস দাবি করেন। ১৪ মে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে। ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, “আসামিপক্ষ এই আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের বদলে ‘সংঘাত’ ও ‘অস্থিরতা’ বলে আদালত অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছে।” উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে এবং ২২ জুন রায়ের দিন ধার্য করে।

ইনুর রাজনৈতিক জীবন

১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা হাসানুল হক ইনু ১৯৭০ সালে বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের সময় তিনি প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে দলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনি রাজনীতিতে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে পরাজিত হলেও, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, বর্তমানে তার মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার দেখানো মামলার সংখ্যা ৮৭টি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) একটি মামলা রয়েছে।