বন শহরে ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬: সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা
ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬: সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা

জার্মানির বন শহরে ‘ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক বারবারা মাসিং। মঙ্গলবার (২৫ জুন) জার্মানির বন শহরে ডয়চে ভেলে ভবনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের ১১০টির বেশি দেশ থেকে হাজারের বেশি সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এতে অংশ নেন।

সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ ও চ্যালেঞ্জ

বারবারা মাসিং তাঁর বক্তব্যে সাংবাদিকতার বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘নির্ভীক, সোচ্চার সাংবাদিকতা’ (জার্নালিজম আউট লাউড) এই ফোরামের প্রতিপাদ্য। এর অর্থ সাংবাদিকতাকে শোরগোল করা নয়, বরং ক্রমশ কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে এর আওয়াজ শোনা যাওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হলো মানুষকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং সমাজে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পুনর্নিশ্চিত করা।’

ভুয়া তথ্য ও অ্যালগরিদমের প্রভাব

মাসিং উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীগুলো জনমতকে প্রভাবিত করতে ও গণতান্ত্রিক সমাজকে অস্থিতিশীল করতে এসব কাজ করছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অ্যালগরিদম তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই তার প্রচার বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আবেগপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রায়ই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ ছড়িয়ে দেওয়া অথবা মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাংবাদিকদের ওপর হুমকি ও নিপীড়ন

বারবারা মাসিং বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের ওপর বেড়ে চলা হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ৫০০ জনের বেশি সাংবাদিক এখন কারাগারে বন্দী। দিন দিন আরও বেশি সাংবাদিক নির্বাসনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’ তিনি ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিপীড়নের বিষয়টিও তুলে ধরেন, যা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ডিডব্লিউতে কর্মরত আমাদের অনেক সহকর্মীও এ ধরনের নিপীড়নের শিকার। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আরও বেশি কথা বলা উচিত।’

সাহসী সাংবাদিকদের উদাহরণ

মাসিং হংকংয়ের সাংবাদিক জিমি লাইয়ের কথা উল্লেখ করেন, যিনি ২০২০ সাল থেকে কারাগারে বন্দী। ফোরামে তাঁকে ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’ পুরস্কার দেওয়া হয় এবং তাঁর মেয়ে ক্লেয়ার লাই তা গ্রহণ করেন। এছাড়া তুরস্কের সাংবাদিক আলি ওদুয়ানের কথা বলেন, যিনি তিন মাসের বেশি কারাগারে ছিলেন এবং মুক্তির পরের দিনই কাজে ফিরেছিলেন।

মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার অর্থনৈতিক ভিত্তি

বারবারা মাসিং মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার জন্য অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এআই সিস্টেমগুলো সাংবাদিকতার কনটেন্ট থেকে সুবিধা নিচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর মালিকানা অন্যদের। আমাদের এমন একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দরকার, যা মানসম্পন্ন সাংবাদিকতাকে মূল্যায়ন করবে এবং আয়ের ভাগ কনটেন্ট নির্মাতাদের নিশ্চিত করবে।’

স্বাধীন সাংবাদিকতার বিনিয়োগের সুফল

তিনি ডিডব্লিউ একাডেমি, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট মিডিয়া এবং ইউনেসকোর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন ‘দ্য ভ্যালু অব জার্নালিজম’-এর তথ্য উল্লেখ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ করা প্রতি মার্কিন ডলার সমাজের জন্য ১০০ ডলারের বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, অপতথ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর সমাজকে ৩৫০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

উপসংহার

বারবারা মাসিং তাঁর বক্তব্য শেষে বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো গণতন্ত্র, নিরাপত্তা এবং একটি মুক্ত সমাজের জন্য অপরিহার্য। আসুন, আমরা উচ্চকণ্ঠ হই, আরও সাহসী হই।’ তিনি জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিস, নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয় এবং বন শহর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।