কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সেশনজটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম পিছিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২৩ জুন) বেলা ১১টায় আইন অনুষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে বিভাগের বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা। দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও দাবি
শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার সময়সূচি অনুযায়ী কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ায় তারা আট মাসের তীব্র সেশনজটে পড়েছেন। বিশেষ করে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা প্রায় আট মাস পিছিয়ে যাওয়ায় শিক্ষাজীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও সেশনজট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভাগটিতে প্রায় আট মাসের সেশনজট বিদ্যমান। অনেক সময় পরীক্ষার আগের রাতে পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করা হয় এবং পর্যাপ্ত ক্লাস না নিয়েই কোর্স সম্পন্ন করা হয়। প্রায় সময় অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হয় এবং দেরিতে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে একই কোর্সে একাধিক শিক্ষক দায়িত্ব পালন করায় সেমিস্টার দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বিভাগে কোনো সুস্পষ্ট একাডেমিক রোডম্যাপ না থাকা, ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা, নির্ধারিত সময়ে ক্লাস না নেওয়া এবং বারবার পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে তা পেছানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে ফেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
আজ তারা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। দাবিগুলো হলো:
- আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব কোর্সের ইনকোর্স পরীক্ষার ফল প্রকাশ
- ছয় মাসের মধ্যে বাকি দুই সেমিস্টারের কার্যক্রম সম্পন্ন
- ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাকি দুই সেমিস্টারের বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রকাশ
- পরীক্ষা শেষ হওয়ার আট সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ
- শিক্ষকসংকট দেখা দিলে গেস্ট টিচার নিয়োগের মাধ্যমে কোর্স সম্পন্ন
- এসব বিষয়ে প্রশাসনের লিখিত প্রতিশ্রুতি প্রদান
প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার
আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাসুদা কামাল ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো শোনেন এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা তালা খুলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
উপ-উপাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে একাডেমিক কার্যক্রম বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগের জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এতদিনেও কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এর ফলে আমাদের নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আমরা অলরেডি আট মাসের জটে আটকে গেছি। এর দ্রুত সমাধান চাই।’
শিক্ষক সংকট ও বিভাগীয় প্রধান
আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক সাদিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘বর্তমানে পুরো বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচ জন। এত কমসংখ্যক শিক্ষক নিয়ে বিভাগ পরিচালনা করতে গিয়ে আমাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বিভাগীয় কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনকে জানালেও এখনও নতুন কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।’
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাসুদা কামাল এসে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া শুনেছেন। আগামী সোমবার থেকে তাদের পরীক্ষা শুরু হবে। এছাড়া পরবর্তী দুই সেমিস্টারের একাডেমিক রোডম্যাপ আগামীকালের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।’
উপ-উপাচার্যের বক্তব্য
শিক্ষক সংকট নিরসনের বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাসুদা কামাল বলেন, ‘ইউজিসি থেকে শিক্ষক নিয়োগের অনুমোদন না দেওয়ার কারণে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনুমোদন মিলছে না। তবে উপাচার্য স্যার বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। তিনি দেশে ফিরলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’



