বিএমইউ’র সিদ্ধান্ত: ডা. আবদুল্লাহর ইমেরিটাস প্রফেসর নিয়োগ বাতিল, বেআইনি দাবি
বিএমইউ’র সিদ্ধান্ত: ডা. আবদুল্লাহর ইমেরিটাস প্রফেসর নিয়োগ বাতিল

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর আজীবনের জন্য ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ নিয়োগকে বিধি-বহির্ভূত ও বেআইনি হিসেবে দাবি করেছে। একই সঙ্গে নিয়োগ পাওয়ার পর গত দুই বছর ধরে তিনি কোনো প্রকার শিক্ষাদান বা গবেষণায় যুক্ত না থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত

শনিবার বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এর আগে গত ১৩ জুন সিন্ডিকেট সভার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ২৪ জুন অধ্যাপক আবদুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস প্রফেসর নিয়োগকে বিধি-বহির্ভূত বিবেচনায় বাতিল করা হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধ্যাপক আবদুল্লাহর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, এই নিয়োগকে ঘিরে একাধিক প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্ন উঠেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২২ সালের নিয়োগ ও পরবর্তী পরিবর্তন

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জারি করা অফিস আদেশে ৬৬তম অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক আবদুল্লাহকে তিন বছরের জন্য ইমেরিটাস প্রফেসর নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগকালে তাঁকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায় ছিল সীমিত এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে আবদ্ধ। এই নিয়োগ বিধি মোতাবেক হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সিন্ডিকেট এই নিয়োগ নিয়ে কোনো আপত্তি করেনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওই নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায় প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে প্রফেসর ইমেরিটাস পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আজীবন নিয়োগের বিধানসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এটি ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের জন্য সিন্ডিকেট মিটিং। এ নিয়োগে অধ্যাপক আবদুল্লাহর মাসিক সম্মানী নির্ধারণ করা হয় অধ্যাপক হিসেবে তাঁর অবসরে যাওয়ার সময়ের বেতন-ভাতার সমান। এর পাশাপাশি তিনি আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন।

আর্থিক অনিয়ম ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের বাজেট অধিবেশনে মূল এজেন্ডার বাইরে এই ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন নজিরবিহীন ও বেআইনি। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এই নিয়োগ তড়িঘড়ি বিবেচনার মাধ্যমে একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত অধ্যাপক আবদুল্লাহ এই খাতে আনুমানিক সাড়ে ১৪ লাখ টাকারও অধিক অর্থ গ্রহণ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, প্রফেসর ইমেরিটাস নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী বিভাগীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে উপস্থাপন, উপাচার্যের মাধ্যমে মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কেবল একজন সদস্যের প্রস্তাব অনুযায়ী তাঁকে আজীবনের জন্য প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যোগ্যতা হিসেবে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষাদান ও গবেষণায় অনিয়ম

এই নিয়োগের পর গত প্রায় দুই বছর এ বি এম আবদুল্লাহ নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। এতে বলা হয়েছে, তিনি শিক্ষাদান করেননি, কোনো গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন কি না প্রশাসনকে অবহিত করেননি, কিন্তু ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ইমেরিটাস পদে নিয়োগের নজির রয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোনো প্রফেসর ইমেরিটাসকে আজীবনের জন্য পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক এবং এ ধরনের বিস্তৃত আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের নজির পাওয়া যায় না। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনাকালে দেখতে পায় যে, এই ব্যবস্থার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে।

সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়া

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ব্যবস্থায় প্রফেসর ইমেরিটাস পদ ছিল একটি সীমিত সম্মানিভিত্তিক পদ। কিন্তু ২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে প্রচলিত রীতিতে দেওয়া সম্মানীর পরিবর্তে কার্যত বেতন-সদৃশ আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এই পরিবর্তন প্রফেসর ইমেরিটাস পদের আর্থিক প্রকৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে এবং একটি সম্মানসূচক পদ কার্যত বেতন সদৃশ আর্থিক সুবিধাসংবলিত পদে রূপান্তরিত হয়েছে বলে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সিন্ডিকেট গত ১৩ জুন এক সভায় সমস্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ২৪ জুন অধ্যাপক আবদুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত বিবেচনায় বাতিল করতে বাধ্য হয়। বিধি অনুযায়ী, যদি কোনো নিয়োগ পরবর্তীকালে প্রক্রিয়াগত বা আইনগত ত্রুটির কারণে বাতিল বা অকার্যকর বলে বিবেচিত হয়, তাহলে সেই নিয়োগের ভিত্তিতে দেওয়া আর্থিক সুবিধাও পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রয়েছে।

এর আগে নিয়োগ বাতিলের পর গত ২৫ জুন অধ্যাপক আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ৫০ বছর চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত এবং প্রায় সমান সময় চিকিৎসা শিক্ষায় নিয়োজিত। আমি মনপ্রাণ দিয়ে রোগী ও মানুষের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার লেখা বই দেশে-বিদেশে পাঠ্য। আমাকে যে ইমেরিটাস অধ্যাপক করা হয়েছিল, তা আমার যোগ্যতার ভিত্তিতেই করা হয়েছিল। আমি আরও সম্মান ও সম্মাননা পেয়েছি। কিন্তু যেভাবে এটা বাতিল করা হলো, সেটি নীতিবহির্ভূত। আমি আশা করি এতে আমার সম্মান ক্ষুণ্ন হবে না।’