রামপুরা কোটা আন্দোলনে গুলি ও হত্যার মামলার রায়ের দিন ধার্য ৪ মার্চ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন থেকে সৃষ্ট সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় রাজধানীর রামপুরায় একজনকে গুলি ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের জন্য আগামী ৪ মার্চ দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ট্রাইব্যুনালে এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়, যা প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম নিশ্চিত করেছেন।
মামলার পটভূমি ও আসামিদের পরিচয়
এ মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মোট পাঁচজন আসামি রয়েছেন। অন্য আসামিরা হলেন খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান, সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলাম ভূইয়া এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। এদের মধ্যে চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।
যুক্তিতর্ক ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারক প্যানেলে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন উভয়পক্ষের আইনজীবীরা। প্রসিকিউশন পক্ষ ট্রাইব্যুনালকে জানায়, জুলাই-আগস্টের কোটা আন্দোলন ঘিরে সারাদেশের মতো রামপুরায়ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নিরস্ত্র আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, যা স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য। এছাড়া একইদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন।
প্রসিকিউশন দাবি করে যে, পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দিসহ নথিপত্রে এ মামলার পাঁচ আসামির সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমির হোসেন জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। বাসার কাছে তিনি সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান এবং পুলিশ গুলি শুরু করে। আমির হোসেন দৌড়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের চারতলায় আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ ভবনটির চারতলায় ওঠে এবং আমির হোসেনকে পেয়ে তার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে বারবার নিচে লাফ দিতে বলে। একজন পুলিশ সদস্য তাকে ভয় দেখাতে কয়েকটি গুলিও করেন। ভয়ে আমির হোসেন লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির রড ধরে ঝুলে থাকেন। তখন তৃতীয় তলা থেকে একজন পুলিশ সদস্য আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে ছয়টি গুলি করেন, যা তার দুই পায়ে লাগে।
পরে পুলিশ চলে গেলে আমির হোসেন ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে তৃতীয় তলায় পড়েন, যেখানে তার দুই পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।
মামলার আইনি প্রক্রিয়া
এ মামলায় ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থা। এরপর ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর আদালত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন, যা দিয়ে মামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এখন রায়ের জন্য ৪ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে, যা দেশের আইন ও মানবাধিকার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।



