থানা কি ন্যায়বিচারের পথে বাধা? কুমিল্লা হত্যাকাণ্ডের প্রশ্ন
থানা কি ন্যায়বিচারের পথে বাধা? কুমিল্লা হত্যাকাণ্ড

থানা কি নাগরিকের ন্যায়বিচারের পথে বাধা হতে পারে? একটি মৃত্যু, একটি পরিবার এবং তিনটি থানা—এই তিন উপাদান মিলিয়ে সম্প্রতি কুমিল্লার একটি ঘটনা আবারও আমাদের ফৌজদারি ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরে থাকা কাঠামোগত প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে।

ঘটনার বিবরণ

তরুণ কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর হত্যাকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহে যে তথ্যগুলো এখন পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা একটি মামলা দায়েরের জন্য প্রশাসনিক জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, তিনি চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লার ভাড়া বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন এবং পরবর্তী সময়ে মহাসড়কের পাশে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল কুমিল্লার কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছানোর পরপরই। এর পর থেকেই তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিনের বরাতে জানা যায়, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সকাল পৌনে ৮টার দিকে কোটবাড়ী এলাকার চট্টগ্রামমুখী লেনের পাশে থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

থানার অসহযোগিতা

যেহেতু তাঁর ভাড়া বাসার অবস্থান কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার এখতিয়ারাধীন, তাই পরিবারের সদস্যরা প্রথমে সেখানেই নিখোঁজ–সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দেখা যায়, বুলেট বৈরাগীর মুঠোফোন সর্বশেষ সদর দক্ষিণ উপজেলার একটি এলাকায় সক্রিয় ছিল। সে প্রেক্ষিতে তাঁদের সদর দক্ষিণ থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এভাবে ঘটনাটির প্রাথমিক ধাপে কোতোয়ালি থানা, সদর দক্ষিণ থানা ও ময়নামতি হাইওয়ে থানা—এই তিন ভিন্ন থানার অসহযোগিতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে তদন্তের এখতিয়ার, ঘটনাস্থল নির্ধারণ এবং তথ্য-সমন্বয়ের দিক থেকে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনীর পেশাদারির ওপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন তুলে দেয়।

আইনি বিশ্লেষণ

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো থানার দ্বারস্থ হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক থানা ঘুরে তথ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা—এই পুরো প্রক্রিয়া একটি সাধারণ নিখোঁজ ঘটনাকে ধীরে ধীরে একটি গুরুতর ফৌজদারি অবহেলার দিকে নিয়ে যায়। একটি সম্ভাব্য আমলযোগ্য অপরাধের ঘটনায় এই প্রশাসনিক বিভাজন নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইন কি নাগরিককে থানা খুঁজে বেড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছে?

বাংলাদেশের আইনে পুলিশ কখনোই এফআইআর রেকর্ড গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে তা লিখিতভাবে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। এখানে ‘কোন থানার এখতিয়ার’ তা প্রাথমিক তথ্য গ্রহণে কোনো বাধা হতে পারে না। আইনের ভাষা এখানে স্পষ্ট এবং বাধ্যতামূলক—‘শ্যাল বি রিডিউজড ইনটু রাইটিং’ অর্থাৎ এটি কোনো ‘ডিসক্রিশনারি’ ক্ষমতা নয়, বরং একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় (ললিতা কুমারী বনাম উত্তর প্রদেশ সরকার, ২০১৩) বলা হয়েছে, আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পেলে এফআইআর রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। যদিও এটি বাংলাদেশি আইনের সরাসরি ব্যাখ্যা নয়, তবে উপমহাদেশীয় আইনি কাঠামোতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাগত নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ‘জিরো এফআইআর’ ধারণাটি মূলত একটি সমাধানমুখী প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য হলো—নাগরিক যেন প্রথমে সঠিক থানা খুঁজে না পাওয়ার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন।

জিরো এফআইআর ধারণা

এই ব্যবস্থার মূল দর্শন খুব সাধারণ, তা হলো আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রাথমিক তথ্য যেকোনো থানা তথ্য গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে, সেটিকে রেকর্ড করবে এবং পরে উপযুক্ত থানায় প্রেরণ করবে। অর্থাৎ থানা হলো প্রশাসনিক ইউনিট, কিন্তু পুলিশ হলো একক রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। নাগরিকের কাছে পুলিশের বিভাজন নয়; বরং রাষ্ট্রের একক দায়বদ্ধতাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সমস্যাটা শুধু আইন নয়, বরং আইনের প্রয়োগ। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে থানা পর্যায়ে প্রাথমিক তথ্য গ্রহণে অনীহা বা দায়িত্ব স্থানান্তরের প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে পরিবারগুলো—যারা অনেক সময় জীবনে প্রথমবার থানার দ্বারস্থ হয়—তারা এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরতে বাধ্য হন। এটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; বরং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের ওপর একটি বাস্তব চাপ।

এফআইআরের প্রকৃতি

এফআইআর দায়ের কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, এটা শুধু মামলার তদন্তকার্য শুরু করার একটি প্রাথমিক ধাপ। অনেক সময় একটি মৌলিক ভুল–বোঝাবুঝি দেখা যায়; এফআইআরকে একটি চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এফআইআর হলো শুধু একটি প্রাথমিক তথ্য রেকর্ড। এটি কোনো বিচার নয়, কোনো তদন্তের ফলাফল নয়, বরং তদন্ত শুরু করার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি। এ বিষয়ে উপমহাদেশীয় বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন রায়ে বারবার বলা হয়েছে যে এফআইআর হলো ফৌজদারি তদন্তের শুরুর অবস্থা।

উপসংহার

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মৃত্যুর ঘটনাটি তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তোলে, রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামো কি নাগরিককে প্রাথমিক ন্যায়বিচারের দরজায় সহজভাবে পৌঁছাতে দিচ্ছে, নাকি প্রশাসনিক বিভাজন সেই দরজাকেই জটিল করে তুলছে?

রাষ্ট্র যখন পুলিশকে একটি একক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছে, তখন নাগরিকের কাছে থানার ভিন্নতা কোনো আইনি বাধা হওয়ার কথা নয়। ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো—তথ্য গ্রহণে বাধা না থাকা। আইন কোনো থানা-সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার কাঠামো। যে ব্যবস্থায় একটি পরিবারকে প্রথমে থানা খুঁজতে হয়, সেই ব্যবস্থায় হয়তো আইন আছে, কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রবেশদ্বার এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি।

শামস নজীব প্রথম আলোর সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার

*মতামত লেখকের নিজস্ব