কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেফতার অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে তোলা হয়েছে। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। শনিবার (২৫ এপ্রিল) বেলা ২টার দিকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল আমানের আদালত এই নির্দেশ দেন।
রিমান্ড শেষে কারাগারে
গত বুধবার কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হকের আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজধানীর কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে পিবিআইয়ের কল্যাণপুরের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে তিন দিনের রিমান্ডে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে। আমরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখছি। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হলে আবারও আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হবে। আদালতের নির্দেশে তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
হাফিজুরের পরিচয় ও গ্রেফতার
হাফিজুর রহমান সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার। বর্তমানে তার বয়স ৫২ বছর। ২০২৩ সালে অবসর নেন। গত মঙ্গলবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে পিবিআই সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করেন। পরদিন বুধবার বিকালে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে বুধবার সকালে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন তিনি।
আদালতে হাজির ও নিরাপত্তা
আদালত সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুর ১টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে ঢাকা থেকে হাফিজুর রহমানকে আদালতে আনা হয়। বেলা ২টার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বেলা ২টা ২০ মিনিটে পিবিআই সদস্যরা তাকে কারাগারে নিয়ে যান। পুরো সময়জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ছিল। কেউ যেন ছবি তুলতে না পারে, এজন্য হাফিজুর রহমান মুখে মাস্ক পরে ছিলেন। এ ছাড়া ছবি তোলার চেষ্টা করা হলেও তিনি গাড়ির ভেতরে নিচু হয়ে নিজেকে আড়াল করেন।
ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য সন্দেহভাজন
গত ৬ এপ্রিল একই আদালতে হাজির হয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মামলার অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিন জনের ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার আবেদন করেন। আদালত তাতে সম্মতি দেন। ওই তিন জনের একজন হাফিজুর রহমান। অন্য দুজন হলেন—ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম। তারা বর্তমানে অবসরে আছেন বলে জানা গেছে।
মামলার বাদী ও তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, জাহিদ। শুরু থেকেই তারা এই নামগুলো বলে আসছেন। শাহীন নামে কোনও সৈনিকের কথা তারা জানতেন না; সৈনিক জাহিদের নামই বারবার আলোচনায় এসেছে।
সৈনিকের নাম জাহিদ না শাহীন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের তদন্ত ও পূর্ববর্তী তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্তে ওই সৈনিকের নাম শাহীন উঠে এসেছে। শাহীন আর সৈনিক জাহিদ দুজন আলাদা ব্যক্তি। আমাদের তদন্ত চলছে। তদন্তেই সব বেরিয়ে আসবে।’
ডিএনএ পরীক্ষার অগ্রগতি
হাফিজুরের ডিএনএ পরীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে নেওয়ার পর তার নমুনা সংগ্রহ করেছি। এই পরীক্ষা সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগে। প্রতিবেদন হাতে পেলে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।’
ঘটনার বিবরণ ও তদন্তের ইতিহাস
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি তনু। পরে বহু খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউজের অদূরে একটি জঙ্গলের মধ্যে তার মরদেহ পাওয়া যায়। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
শুরুতে থানা পুলিশ, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনও রহস্য বের করতে পারেনি। সর্বশেষ পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পিবিআইয়ের ঢাকা সদর দফতরে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআই সদর দফতরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।



