প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ডিজিটাল আইডি ও ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনা সরকারের
সরকারের ডিজিটাল আইডি ও ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনা

দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য 'ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট' নীতি প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, জন্মের পর থেকেই একটি শিশুর ডিজিটাল আইডি চালু হবে, যা যুক্ত থাকবে ডিজিটাল ওয়ালেটের সঙ্গে। এই ওয়ালেট ব্যাংক ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবার (এমএফএস) সঙ্গে যুক্ত করা যাবে। দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্যই এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে 'নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা: উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা' শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা এ কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি)।

সংযোগ ও ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের লক্ষ্য

দেশে মুঠোফোন ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিপুল হলেও সেবার মান বিশ্বের অন্যতম খারাপ বলে মন্তব্য করেন রেহান আসিফ আসাদ। পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের কাছে সংযোগই (কানেকটিভিটি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং ব্যবহারকারীদের ১০০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ ছাড়া অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে ডিজিটাল আইডি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসার ও মুঠোফোন সেবায় কর কমানো। ব্রডব্যান্ড সেবার দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্মার্টফোনের দাম কমানোর উদ্যোগ

দেশে এখনো ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে স্মার্টফোন নেই উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের লক্ষ্য ডিভাইসের দাম কমিয়ে আনা। স্মার্টফোনের দাম আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় নামাতে সরকার কাজ করছে। একজন কৃষক, দিনমজুর বা রিকশাচালকও যেন একই রকম ডিভাইস ব্যবহার করার সুযোগ পান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুঠোফোন সেবায় কর কমানোর পরিকল্পনা

মুঠোফোন সেবায় করের হার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়কারী দেশ বাংলাদেশ। একজন সাধারণ গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে মাত্র ৬২ টাকার সেবা পান, বাকি ৩৮ টাকা সরকার কর হিসেবে নিয়ে নেয়। এটি মুঠোফোন উৎপাদক, ভেন্ডর ও অপারেটর—সবার উপরই চাপ সৃষ্টি করছে। পুরো টেলিযোগাযোগ খাত পর্যালোচনা করে এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ব্যবহারকারীরা ১০০ টাকায় ৮০ থেকে ৯০ টাকার সেবা পান।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু নীতি ও নির্দেশনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন স্তরে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি মনে করেন, এতে মুঠোফোন অবকাঠামোয় এক বা দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ট্যারিফ নির্ধারণে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং গ্রাহকদের ব্যয় বাড়াবে। এ ছাড়া ফাইবার ব্যাকবোন (উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক), আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আন্তর্জাতিক কল ও ডেটা আদান-প্রদানের প্রধান প্রবেশপথ) ও ডেটা সেন্টার বিদেশি নিয়ন্ত্রণে গেলে ডেটার সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে এবং নজরদারির ঝুঁকি বাড়বে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

বিটিআরসির চেয়ারম্যানের বক্তব্য

সেমিনারে অংশ নেওয়া ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স), আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা (আইএসপি) অপারেটরদের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) তাঁদের মতামতের গুরুত্ব না দিয়েই নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন করছে। তাঁরা নতুন সরকারের কাছে এ নীতিমালা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে দেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী। তিনি বলেন, নীতিমালা তৈরির সময় শিল্প খাত, শিক্ষাবিদ ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পুরো খাতের স্বার্থ রক্ষা করাই এ নীতিমালার মূল লক্ষ্য। নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এসব নীতিমালা আবারও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। এতে আরও বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল, দেশের ইন্টারনেট সংযোগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি আমিনুল হাকিম, ফাইবার অ্যাট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী, মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার প্রমুখ।