পরিচ্ছন্ন ও ঝুঁকিমুক্ত নগরী গড়তে রাজধানী থেকে অবৈধ অ্যানালগ বিলবোর্ড অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে এরই মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল বিলবোর্ড। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়কের মাঝখানে ও পাশে স্থাপিত এসব বিলবোর্ডকে নতুন এক ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে দেখছেন অনেক চালক ও পথচারী। সন্ধ্যা নামলেই এসব বিলবোর্ডের আলো-আঁধারির খেলায় যানবাহন চালাতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
সড়কের মাঝে ডিজিটাল বিলবোর্ড
সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন শেওড়াপাড়া থেকে আগারগাঁও সড়কের মাঝের রোড ডিভাইডারের বড় অংশজুড়ে বসানো হয়েছে ডিজিটাল বিলবোর্ড। সড়কের দুই পাশেও রয়েছে এমন বোর্ড। একই চিত্র দেখা যায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ধানমন্ডি, পান্থকুঞ্জ পার্ক, মৎস্য ভবনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।
চালকদের অভিযোগ
সড়কের বড় বড় ডিজিটাল বিলবোর্ডের কারণে মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক ও মাইক্রোবাস চালকদের রাতের বেলা গাড়ি চালাতে সমস্যার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। উল্টো তাদের দাবি, এলইডি বিলবোর্ড রাজধানীর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে এবং এ থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্বও আদায় হচ্ছে।
আগারগাঁও সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালক মাহমুদ রাফি বলেন, ‘আগে রাজধানীতে যত্রতত্র অবৈধ বিলবোর্ড ছিল। সেগুলো অপসারণ সিটি করপোরেশনের ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এখন যেখানে-সেখানে ডিজিটাল বিলবোর্ড বসানো হচ্ছে। এগুলোতে যেভাবে আলোর পরিবর্তন হয়, তাতে ড্রাইভিং করতে সমস্যা হয়।’
মাইক্রোবাস চালক মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘গাড়ি চালানোর সময় অটোমেটিক ডিজিটাল বিলবোর্ডের দিকে নজর চলে যায়। এতে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। একপলক তাকালেও সামনে তিন থেকে চার সেকেন্ড ঠিকমতো দেখা যায় না। বিশেষ করে সড়কের টার্নিং পয়েন্টে থাকা বিলবোর্ডগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।’
নীতিমালা লঙ্ঘন
সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞাপন নীতিমালা-২০০৩-এর ৯(৬) উপধারায় ‘আলোকিত ডিসপ্লের ক্ষেত্রে’ বলা হয়েছে, ট্রাফিক সেফটির জন্য হুমকি হতে পারে—এমন আলোকিত বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। এছাড়া ড্রাইভার বা পথচারীর দৃষ্টিতে ঝলক সৃষ্টি করে, ফ্ল্যাশিং বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলোর বিজ্ঞাপন এবং ট্রাফিক সিগন্যালের কার্যকারিতা ব্যাহত করে—এমন বিজ্ঞাপনও নিষিদ্ধ।
একই নীতিমালার ‘ইলেকট্রিক সাইন’ সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছে, সড়কের মিডিয়ান ও রাস্তার পাশ থেকে ১০ ফুটের মধ্যে কোনও সাইন স্থাপন করা যাবে না। ট্রাফিক সিগন্যাল বিঘ্নিত না করে ফুটপাত থেকে কমপক্ষে ৬ মিটার উঁচুতে তা স্থাপন করতে হবে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত এলইডি বিলবোর্ডে এসব নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জুনায়েদ কবির সোহাগ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিলবোর্ডগুলো সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত। ডিজিটাল বিলবোর্ড বা এলইডি স্ক্রিনের জন্য প্রতি বর্গফুটে ২০ হাজার টাকা এবং এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নেওয়া হয়।’
চালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল বিলবোর্ড নিয়ে নীতিমালায় আগে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলেও এখন রয়েছে। চালকদের অসুবিধা কমাতে আমাদের টেকনিক্যাল টিম বিষয়টি দেখছে। মোড়ে তুলনামূলক কম বিলবোর্ড দেওয়া হয়।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দক্ষিণ সিটি এলাকায় যেসব বিলবোর্ড রয়েছে, সেগুলো অনুমোদিত। আমরা বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছি। এতে একদিকে রাজস্ব আয় হচ্ছে, অপরদিকে আমরা যে সবুজায়ন করেছি তার রক্ষণাবেক্ষণেও সহায়তা মিলছে। তবে যানবাহন চলাচলে যদি এসব বিলবোর্ড কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।’
এ বিষয়ে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



