বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারের জায়গা, বিদ্যুৎ আর পানির জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রযুক্তিবিশ্ব। এই সংকটের এক অবিশ্বাস্য সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অরবিটাল। মাত্র পাঁচ মাস বয়সী স্টার্টআপটি মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার তৈরির জন্য এক লাখ এআই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছে।
এফসিসিতে আবেদন ও তহবিল সংগ্রহ
স্পেসনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ জুন অরবিটাল মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে এক লাখ স্যাটেলাইট মোতায়েন করে ১০ গিগাবাইট কম্পিউটিং পাওয়ার বা গণনাক্ষমতা তৈরি করা, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান এআইয়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এই আবেদনের মাত্র কয়েক দিন আগেই প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে।
স্যাটেলাইটের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
অরবিটালের এফসিসি আবেদন অনুযায়ী, তারা ৫০০ থেকে ৮৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় ১০০ কিলোওয়াট শ্রেণির স্যাটেলাইট স্থাপন করবে। প্রতিটি স্যাটেলাইটের সৌর প্যানেল ও রেডিয়েটর চওড়া হবে প্রায় ১০০ মিটার। এই অরবিটাল ডেটা সেন্টার সিস্টেম মূলত স্পেসএক্সের স্টারলিংকের মতো তৃতীয় পক্ষের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সঙ্গে অপটিক্যাল ইন্টারস্যাটেলাইট লিংকের ওপর ভিত্তি করে লেজার প্রযুক্তিতে যোগাযোগ করবে।
পূর্ববর্তী উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানের পটভূমি
এ ধরনের মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টারের পরিকল্পনা এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে স্টারক্লাউড এবং কাউবয় স্পেসের মতো প্রতিষ্ঠান একই ধরনের আবেদন জমা দিয়েছিল। অরবিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউউইন পুউন এর আগে স্পিন নামক একটি ইলেকট্রিক স্কুটার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে পরে ফোর্ডের কাছে বিক্রি করেছিলেন। তিনি মনে করেন, মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপন করা খুব জটিল কিছু নয়। তাঁর মতে, এগুলো মূলত সৌর প্যানেল, রেডিয়েটর ও ইলেকট্রনিকসের সমন্বয়ে গঠিত সাধারণ সিস্টেম, তবে শুধু এগুলোকে মহাকাশের শূন্যতা ও ক্ষতিকর বিকিরণ সহ্য করার উপযোগী করে তৈরি করতে হবে।
পার্থিব ডেটা সেন্টারের সমস্যা ও মহাকাশের সুবিধা
পৃথিবীর মাটিতে ডেটা সেন্টার তৈরি করতে গেলে প্রচুর জমি, শীতলীকরণের জন্য বিপুল পরিমাণ পানি এবং ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মহাকাশে পাঠালে এই তিন সমস্যারই সমাধান পাওয়া যায়। মহাকাশে অবিরাম এবং তীব্র সূর্যরশ্মি পাওয়া যায়, যা থেকে অন্তহীন সৌরশক্তি উৎপাদন সম্ভব। মহাকাশের প্রাকৃতিক শীতল পরিবেশের কারণে কোনো পানির প্রয়োজন ছাড়াই রেডিয়েশনের মাধ্যমে সিস্টেম ঠান্ডা রাখা যায়। পৃথিবীর জমির ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি হয় না।
চ্যালেঞ্জ ও স্পেসএক্সের ভূমিকা
অরবিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউউইন পুউন জানিয়েছেন, স্যাটেলাইট তৈরি করা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয়, আসল চ্যালেঞ্জ হলো এগুলোকে মহাকাশে পাঠানো। বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাতে হলে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভারী মহাকাশযানের প্রয়োজন। ঠিক এই কারণে অরবিটালসহ এই খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বর্তমানে স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটের বাণিজ্যিক সফলতার অপেক্ষায় রয়েছে। স্টারশিপ যদি নিয়মিত এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট হিসেবে উড্ডয়ন শুরু করে, তবেই মহাকাশে এই বিশাল কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। কারণ, এটি উৎক্ষেপণের খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে।



