বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর স্মার্টফোন প্রযুক্তি: আঙুলের ছাপেই মিলবে রক্তের তথ্য
বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর স্মার্টফোন প্রযুক্তি: আঙুলেই রক্তের তথ্য

আঙুলের ছাপ বা মুখ স্ক্যান করে স্মার্টফোন আনলক করার অভ্যাস এখন সবার। কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ড. শেখ ইকবাল আহমেদের গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আঙুলের ডগায় ক্যামেরা ধরলেই শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা জানাতে পারে, এবং ভবিষ্যতে রক্তের শর্করা, হিমোগ্লোবিন বা ক্রিয়েটিনিনের মাত্রাও মাপা সম্ভব হবে।

সিরিঞ্জের যুগের অবসানের স্বপ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের মারকুয়েট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শেখ ইকবাল আহমেদ বলেন, 'আমার স্বপ্ন এমন সব প্রযুক্তি তৈরি করা, যেগুলোতে মানুষের শরীরে কোনো সিরিঞ্জ ঢোকানোর দরকার হবে না। আপনার মুখের দিকে তাকিয়েই আমি স্মার্টফোনের মাধ্যমে বলতে পারব, আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি কিনা।' বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণায় যোগ দেন। তাঁর লক্ষ্য স্মার্টফোনকে একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা, যেখানে অনেক পরীক্ষার জন্য সিরিঞ্জের প্রয়োজন হবে না।

ইউবিহোয়াইট প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি

গবেষণাগারে উদ্ভাবিত 'ইউবিহোয়াইট' নামের প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে পেটেন্ট পেয়েছে এবং পাইলট প্রকল্পে সফল ফল দিয়েছে। এই প্রযুক্তিতে একটি ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত স্মার্টফোন ক্যামেরা, এলইডি ফ্ল্যাশলাইট এবং একটি ছোট চুম্বক ব্যবহার করে আঙুলের ডগার রক্তপ্রবাহ বিশ্লেষণ করা হয়। প্রথমে ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত ক্যামেরা দিয়ে আঙুলের ডগার ক্ষুদ্র রক্তনালির ভিডিও ধারণ করা হয়। বিশেষ আলোক ব্যবস্থার কারণে ক্যামেরা রক্তপ্রবাহ আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পারে। একই সঙ্গে একটি ছোট চুম্বক রক্তপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে সহায়তা করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিডিওটি ফ্রেম-বাই-ফ্রেম বিশ্লেষণ করে রক্তপ্রবাহের সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করে। শ্বেত রক্তকণিকার উপস্থিতির কারণে রক্তপ্রবাহে যে পরিবর্তন ঘটে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেই সিস্টেমটি শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা অনুমান করে। লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা এবং বিভিন্ন গুরুতর সংক্রমণ শনাক্ত করতে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণা ইতিমধ্যে নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস এবং আইইইই-এর মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাথমিক সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

গবেষণাগারে ২০ জন রোগীর ওপর চালানো প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তির ফল প্রচলিত ল্যাব পরীক্ষার ফলাফলের খুবই কাছাকাছি। আরও বড় পরিসরে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করতে বর্তমানে জর্জিয়া ক্যানসার সেন্টারের সহযোগিতায় ২০০ জন রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গবেষকদের সঙ্গেও এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

শুধু শ্বেত রক্তকণিকাই নয়, তাঁর গবেষণাগার এখন একই ধরনের ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে রক্তের গ্লুকোজ, হিমোগ্লোবিন, ক্রিয়েটিনিন, রক্তচাপ এবং হৃৎস্পন্দনের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যসূচক পরিমাপের প্রযুক্তিও উন্নয়নের কাজ করছে। তবে এসব প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়েই রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় সম্ভাব্য প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর এক বিলিয়নেরও বেশি কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) পরীক্ষা করা হয়, যার প্রতিটির গড় খরচ প্রায় ৩০ ডলার। স্মার্টফোনভিত্তিক এই প্রযুক্তি সফল হলে শুধু পরীক্ষার খরচই কমবে না, বরং রোগীরা ঘরে বসেই নিয়মিত নিজেদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ল্যাবের ডক্টরাল শিক্ষার্থী সাকিফা আক্তার বলেন, 'ডাক্তারের কাছে যাওয়া কিংবা ল্যাব টেস্ট করানো অনেক ব্যয়বহুল। এমনকি স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও খরচ হয়। আমাদের লক্ষ্য, বাড়িতে এবং হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য কম খরচের, ব্যথামুক্ত ও সিরিঞ্জবিহীন একটি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা।'

এই প্রযুক্তি পুরোপুরি সফল হলে রোগীরা ঘরে বসেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে সেই রিপোর্ট সরাসরি চিকিৎসকের কাছেও পাঠানো যাবে। এতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষার ঝামেলা অনেকটাই কমে আসবে।

ইউবিভাইটাল ও বাণিজ্যিক পথচলা

ইউবিহোয়াইট প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শেখ ইকবাল আহমেদ 'ইউবিভাইটাল' নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের সিড ফান্ডিং পেয়েছে এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের ফাউন্ড্রি বুটক্যাম্পে নির্বাচিত হয়েছে। গবেষণাগারের সদস্যদের মতে, এই প্রযুক্তি এখনই প্রচলিত ল্যাব পরীক্ষার বিকল্প নয়; বরং এটি হবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের একটি সহজ ও কম খরচের সহায়ক ব্যবস্থা। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল বা যেসব মানুষের নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া কঠিন, তাঁদের জন্য এটি বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

ইউবিকম্প ল্যাবের ডক্টরাল শিক্ষার্থী পারমিতা বসাক উপমা বলেন, 'ড. আহমেদ প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে সময় দেন এবং গবেষণায় উৎসাহিত করেন।' পোস্টডক গবেষক পদ্মপ্রিয়া ভেলুপিল্লাই মেকান্দান বলেন, 'তিনি নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা দেন এবং সঠিক দিকনির্দেশনাও দেন।' শেখ ইকবাল আহমেদের ভাষায়, 'এই ল্যাবের আসল শক্তি এখানকার শিক্ষার্থীরা। তারাই এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।'

সূত্র: মারকুয়েট টুডে ডটকম