ওপেনএআই মামলায় সাক্ষ্য দিলেন ইলন মাস্কের চার সন্তানের মা শিবন জিলিস
ওপেনএআই মামলায় সাক্ষ্য দিলেন মাস্কের চার সন্তানের মা

ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের একটি মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য শিবন জিলিস। তিনি ইলন মাস্কের চার সন্তানের মা। ওপেনএআইকে একটি মুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ইলন মাস্ক যে মামলা করেছেন, তার অংশ হিসেবে স্থানীয় সময় বুধবার ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে কয়েক ঘণ্টা ধরে সাক্ষ্য দেন জিলিস।

মামলার পটভূমি

মাস্কের অভিযোগ, আদর্শিক বিচ্যুতির মাধ্যমে স্যাম অল্টম্যান ওপেনএআইকে একটি লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করেছেন। ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে এ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জিলিস ওপেনএআইকে লাভজনক কোম্পানি করার প্রাথমিক আলোচনায় নিজের সম্পৃক্ততা এবং ইলন মাস্কের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে জানান, মাস্কের প্রস্তাবে রাজি হয়ে কীভাবে তিনি চার সন্তানের মা হয়েছেন।

সাক্ষ্যের মূল বিষয়

আদালতে তার সাক্ষ্যের মূল বিষয় ছিল ওপেনএআইয়ের শুরুর দিকে এটিকে মুনাফাভোগী কোম্পানি করার বিষয়ে মাস্কের সাথে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা। একই সাথে তিনি যখন ওপেনএআইয়ের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন, তখন কীভাবে মাস্কের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে—সে বিষয়গুলোও আলোচনায় আসে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সন্তান গ্রহণের বিষয়ে জিলিস বলেন, ‘আমি মনেপ্রাণে মা হতে চেয়েছিলাম। ঠিক ওই সময়ে ইলন আমাকে একটি প্রস্তাব দেন এবং আমি তা গ্রহণ করি।’ তিনি জানান, ২০২০ সালের দিকে মাস্ক তাকে ‘স্পার্ম’ (শুক্রাণু) দান করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জিলিস আরও বলেন, ‘ইলন ওই সময় তার চারপাশের সবাইকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে আমার কোনো সন্তান নেই, তাই তিনি নিজেই এই সহায়তার প্রস্তাব দেন।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিলিসের পেশাগত পটভূমি

সিলিকন ভ্যালিতে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন শিভন জিলিস। তিনি ইলন মাস্কের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং নিউরোটেকনোলজি কোম্পানি নিউরালিংকেও নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওপেনএআই প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর, ২০১৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। বুধবার তিনি বলেন, ওই সময়ই প্রথম মাস্কের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী

মাস্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ওপেনএআই—দুই জায়গাতেই দায়িত্ব পালন করায় চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় জিলিসকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, ২০১৮ সালে মাস্ক প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার পর জিলিস তার কাছে ওপেনএআই সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহ করতেন। মাস্ক ওপেনএআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থ সহায়তাও দিয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও গোপনীয়তা

জিলিস জানান, প্রায় এক দশক আগে মাস্কের সঙ্গে তার ‘একবারের’ রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল। তবে ২০২০ সালে, যখন মাস্ক প্রথম তার সন্তানের বাবা হওয়ার প্রস্তাব দেন, তখন তাদের মধ্যে কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল না। তিনি বলেন, কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে বিয়ে করে সন্তান নেওয়ার প্রচলিত ব্যক্তিগত পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়েছিল তাকে।

জিলিস জানান, মাস্কের সঙ্গে তার প্রথম দুই সন্তানের ক্ষেত্রে শুরুতে মাস্ককে সক্রিয় বাবার ভূমিকায় রাখার পরিকল্পনা ছিল না। এছাড়া সন্তানের পিতৃত্বের বিষয়টি ‘কঠোরভাবে গোপন’ রাখতেও দুজন একমত হয়েছিলেন। তবে বর্তমানে মাস্ক জিলিসের সঙ্গে তার চার সন্তানের জীবনেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, পরিবার হিসেবে তারা সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটান।

গোপনীয়তা চুক্তি

জিলিস বলেন, মাস্কের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি থাকায় ২০২১ সালে জন্ম দেওয়া যমজ সন্তানের বাবা যে মাস্ক, তা ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানকে তিনি জানাননি। পরের বছর বিজনেস ইনসাইডারে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের আভাস পাওয়ার পর তিনি অল্টম্যানকে বিষয়টি জানান। তবুও অল্টম্যান এবং ওপেনএআই প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান চাইছিলেন, জিলিস যেন পরিচালনা পর্ষদে থেকে যান। বুধবার জিলিস বলেন, অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

বোর্ড ছাড়ার কারণ

সপ্তাহের শুরুতে জিলিসের দীর্ঘদিন ওপেনএআইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্রকম্যান বলেন, ‘ইলন-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা তার ওপর আস্থা রেখেছিলাম।’ ২০২৩ সালের মার্চে জিলিস ওপেনএআইয়ের বোর্ড ছাড়েন। সে সময় মাস্ক এক্সএআই চালু করছিলেন, যা ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাটবট তৈরির কাজ করছে।

ইমেইল ও বার্তালাপ

মামলার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত ইমেইল ও বার্তালাপ থেকে জানা যায়, ওপেনএআইয়ের করপোরেট কাঠামো পরিবর্তন নিয়ে জিলিস, অল্টম্যান, ব্রকম্যান ও মাস্কের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছিল। আদালতে উপস্থাপিত লিখিত বার্তালাপে দেখা যায়, ২০১৭ সালেই ওপেনএআইকে বড় পরিসরে বাড়াতে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহের জন্য অলাভজনক কাঠামো থেকে সরে আসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। ওই আলোচনায় মাস্কও যুক্ত ছিলেন।

ব্রকম্যান এবং ওপেনএআইয়ের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়া সুটস্কেভার প্রতিষ্ঠানটিকে 'বি কর্প' কাঠামোয় রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন। এটি এমন এক ধরনের লাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা নির্দিষ্ট সামাজিক লক্ষ্যও অনুসরণ করে। জিলিসের ইমেইল থেকে আরও জানা যায়, ওপেনএআইয়ের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন মাস্ক। তিনি পরিচালনা পর্ষদে অতিরিক্ত আসনের দাবি জানান এবং ওপেনএআইকে টেসলার অংশ করার প্রস্তাবও দেন। এমনকি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির 'বি করপ' সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও ওপেনএআইকে গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন।

জিলিস এক লিখিত বার্তায় বলেছিলেন, ওপেনএআইয়ের জন্য এমন পদক্ষেপ ‘তাৎক্ষণিকভাবে অর্থায়নের সমস্যার সমাধান করবে।’ তবে শেষ পর্যন্ত অল্টম্যান, ব্রকম্যান ও সুটস্কেভার মাস্কের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। আদালতে উপস্থাপিত জিলিসের এক ইমেইলে বলা হয়, এর বড় কারণ ছিল—তারা সবাই দৃঢ়ভাবে চেয়েছিলেন, মাস্ক যেন ওপেনএআইয়ের কাজের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ না পান।